
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১১:৪১ পিএম
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীরে ভারতের মাথাব্যথা কেন?

যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২৮ পিএম

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য চীন খুবই আগ্রহী। আর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের কাছে আগে থেকেই পরিচিত। এ কারণেই তাকে এত সম্মান দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কথাগুলো বলেছেন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর ছাড়াও চীন-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি অনেক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফখরুল ইসলাম।
যুগান্তর : প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ড. ইউনূস নিঃসন্দেহে পাশ্চাত্য জগতে অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। সেখানে তাকে সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে দেখা হয়। এজন্য বিভিন্ন সরকার তাকে বিভিন্নভাবে সম্মানে ভূষিত করেছে, পদক দিয়েছে। এর অর্থ এ নয়-তিনি চীনে সম্মানিত ব্যক্তি নন। বরং সেখানেও তিনি বেশ সমাদৃত। তিনি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আগে চীনের অনেক স্থানে তার ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থাটি প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি কয়েকবার চীন সফর করেছেন। কাজেই চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। তো এ ধরনের বড় মাপের মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত সব ধরনের মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হন নিজের গুণে। এখানে এ সফর নিয়ে নেতিবাচক যেসব প্রচারণা যারা করছে, তারা আসলে এ মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতির পরিস্থিতি থেকে ভারতকে কিছু সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এ ধরনের কথাগুলো বলছে। তিনি চীনের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে চীনের প্রেসিডেন্ট কেন তার ব্যক্তিগত বিমান তার জন্য পাঠাবেন? ইতিহাসে এ রকম নজির কি আর দ্বিতীয়টি আছে? এর আগেও বাংলাদেশে অনেক রাষ্ট্রপতি ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাদের জন্য তো এ ব্যবস্থা করা হয়নি। দেখা যাচ্ছে, চীন খুবই আগ্রহী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য।
যুগান্তর : ভারত ও চীন, এ দুদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
ড. মাহবুব উল্লাহ : চীন ও ভারত আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুটিই বিশাল প্রতিবেশী। দুটি বহুল জনসংখ্যার দেশ। কিন্তু দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের অনেক ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিয়ে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ছোট ছোট অনেক বিষয় নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ভারত একটু ভিন্নদৃষ্টিতে তাইওয়ানকে দেখতে শুরু করেছে। এটাও চীনের জন্য অস্বস্তিকর। তবে চীনকে বাদ দিয়ে ভারত যেমন চলতে পারবে না, আবার ভারতকে বাদ দিয়েও চীন চলতে পারবে না। কারণ দুদেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়াও কিন্তু সম্ভব নয়। তবে ভারত যেটা চাইবে বা চায়, আমরা (বাংলাদেশ) যেন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ না হয়ে ভারতের তাঁবেদারিতে থাকি। আমি এখানে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শব্দটি ব্যবহার করলাম না। কিন্তু এটা তো স্বাধীন জাতি হিসাবে আমাদের কাম্য নয়। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তো নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর দুদেশের এ সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্যাপন হতে যাচ্ছে। সে হিসাবে এবারের চীন সফর দুদেশের সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এ সম্পর্কে এড়িয়ে যেতে পারে না। এটিকে অবহেলা করতে পারে না। বরং এটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের সঙ্গেও আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের ৭০ শতাংশই আসে চীন থেকে। তাছাড়া চীনের সঙ্গে আমাদের বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে, যদিও এটি ঘাটতি বাণিজ্য। তৎসত্ত্বেও দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে এ বাণিজ্য অপরিহার্য। এসব বিষয় বিবেচনা করে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে, এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা। এ বিষয়ে ভারত অসন্তুষ্ট হলো কি না, এটি বাংলাদেশের দেখার বিষয় নয়। কারণ, জাতি হিসাবে আমরা স্বাধীন জাতি, এক্ষেত্রে ভারত যদি আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, আমরাও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখব। এর মানে এ নয় যে, একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে গিয়ে অন্যজনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করব। আমরা কারও সঙ্গেই সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না। আমরা সেই সম্পর্ককে স্বাগত জানাই, যে সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থে উপযোগী।
আপনারা নিশ্চয় জানেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের জন্য চীনের প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ সফরে তিনি বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক অনেক সম্মেলনে ভাষণও দিয়েছেন। তারপর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে। যদিও সবদিক থেকে চীনের পক্ষ থেকে ইউনূসকে উষ্ণ আমন্ত্রণ বা অভ্যর্থনা জানানো হয়।
যুগান্তর : চীনের সঙ্গে যদি বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হয়, সেক্ষেত্রে ভারতের এত মাথাব্যথা কেন?
ড. মাহবুব উল্লাহ : দেখুন, এটি তো অনেক পুরোনো ব্যাপার। ১৯৬২ সালে সীমান্ত যুদ্ধ হওয়ার পর থেকে দুটি দেশের সম্পর্ক বলতে গেলে মসৃণ নয়। সেই সম্পর্কের ভেতরে অনেক বিরোধ লুকিয়ে আছে, বিশেষ করে সীমান্ত জমি নিয়ে। এছাড়া আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে। কাজেই ভারত মনে করে, চীনের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক যদি বৃদ্ধি পায়, ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। কারণ হলো, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ভারতের ‘চিকেন নেক’ পথটি রয়েছে। ভারত এটি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। তখন ভারত মনে করে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যদি সম্পর্ক গভীর হয়, তাহলে এ চিকেন নেক ভারতের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ হয়তো চিকেন নেক প্রশ্নে চীনের আহ্বানে সাড়া দিতে পারে, এ ধরনের একটি মাথাব্যথা ভারতের মধ্যে আছে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ভারতের মনটা খুবই ছোট। এরা বড় মাপে বা বড় মনে কোনো কিছু চিন্তা করতে পারে না। পারে না বলেই পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। পতিত শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ‘স্বামী-স্ত্রী’ সম্পর্ক ছিল, এটি বর্তমানে নেই, কারণ আমরা এমন সম্পর্ক পেছনে ফেলে আগামী দিনে সমতার ভিত্তিতে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে, বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাই। এ চেষ্টা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হবে না। আমার মনে হয়, বিশ্ব শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে যে আন্তঃসম্পর্ক, সে আন্তঃসম্পর্কের নতুন বিন্যাস ঘটবে। এ বিষয়টি নিয়ে আমি এখনই আজ বিস্তারিত কিছু বলতে চাচ্ছি না, তবে আমি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারি, সেই আন্তঃসম্পর্কটি হবে আমেরিকাকেন্দ্রিক। আমেরিকাকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে অন্যরা একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করবে। সেই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে চীন ও ভারতের সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে পারে। তবে খুব সহজেও নয়, নিকট ভবিষ্যতেও নয়।