
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:৫১ এএম
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৫, ০৮:২৭ পিএম

হামিম গ্রুপের জিএম ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার আহসান উল্লাহ। ফাইল ছবি
আরও পড়ুন
আট মাস আগে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সাইফুল ইসলামকে (৩৯) ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ দেন হামিম গ্রুপের জিএম ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার আহসান উল্লাহ (৪৮)। চালককে বিশ্বাস করে অনেক কিছুই শেয়ার করতেন তিনি।
কিন্তু এরপর থেকেই একটি অপহরণকারী চক্রের টার্গেটে পরেন আহসান উল্লাহ। সাইফুল ইসলাম ওই চক্রের অন্যতম সদস্য। সাইফুল সার্বক্ষণিক নজর রাখতেন আহসান উল্লাহর ওপর। অবশেষে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার লোভে আহসান উল্লাহকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে চক্রটি। তার কাছে থাকা ৫৮ হাজার টাকাও ছিনিয়ে নেয়। হত্যার আগে এই টাকা থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে ইফতার কিনে আহসান উল্লাসহ খুনিরা ইফতার করে। অপহরণকারীরা পরিচিত হওয়ায় আহসান উল্লাহকে হত্যা করে তুরাগে ফেলে দেয়।
এ মামলায় গাড়িচালক সাইফুল ইসলামসহ (৩৯) দুইজনকে গ্রেফতারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গ্রেফতার অপর আসামি হলেন- নূর নবী মিয়া (১৯)।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, আহসান উল্লাহকে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগে মঙ্গল ও বুধবার র্যাব ১ ও ১৩ এর যৌথ অভিযানে দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়। গত মঙ্গলবার নিজ বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানাধীন ফলগাছা এলাকা থেকে মো. সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাবার নাম মৃত খাজির উদ্দিন।
এছাড়া বুধবার লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ থানাধীন হররাম উত্তরপাড়া নিজ বসত ঘর থেকে মো. নূর নবী মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব-১ এর সিপিসি-২ কোম্পানি কমান্ডার মেজর মুহাম্মদ আহনাফ রাসিফ বিন হালিম যুগান্তরকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে অতি লোভে একটি চক্র জিএম আহসান উল্লাহর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৩ মার্চ বিকেল ৩টার পর জিএম আহসান উল্লাহ অফিস থেকে বের হলে অপহরণ করে চক্রটি। আশুলিয়া এলাকা থেকে চারজন তাকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে।
তিনি আরও জানান, খুনিরা গত সাত মাস ধরে জিএম আহসান উল্লাহর সব খোজ খবর রাখতেন। তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার আহসান উল্লাহর লাইফস্টাইল থেকে শুরু করে সব কিছুই জানত। ঈদের জন্য কিছু টাকা উসুল করতে চেয়েছিল অপহরণকারী চক্রটি। টাকা নেওয়ার পর তারা ভাবেন, আহসান উল্লাহকে ছেড়ে দিলে তাদের পরিচয় বলে দেবে। ফলে আহসান উল্লাহকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে, এরপরও বেঁচে ছিল সে। তখন খুনিদের একজন তাকে পানি খাওয়ায়।
এসময় হঠাৎ করে অবস্থার অবনতি হয় আহসান উল্লাহর। একপর্যায়ে মারা যায় আহসান উল্লাহ। পরে তাকে টেনে হিঁচরে তুরাগে নিয়ে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় আরও দুইজন আসামি পলাতক আছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাহাত খান যুগান্তরকে জানান, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আরও কয়েকজন নজরদারিতে আছে।
এর আগে তুরাগ ১৬ নম্বর সেক্টর ফাকা সড়কের পাশ থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয় আহসান উল্লাহর। মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পরে জানা যায়, তার নাম আহসান উল্লাহ। তিনি হামিম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার। আহসান উল্লাহ পরিবার নিয়ে মিরপুর দিয়াবাড়ি চন্ডাল ভোগ এলাকায় থাকতেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে গত ২৩ মার্চ থানায় আহসান উল্লাহর নিখোঁজের একটি জিডি করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর গত মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, আহসান উল্লাহ হা-মীম গ্রুপের আশুলিয়ার দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাসা তুরাগ থানাধীন চন্ডালভোগ এলাকায়। বাসা থেকে নিজস্ব প্রাইভেটকারে অফিসে যাতায়াত করতেন।
প্রতিদিনের মত গত রোববার সকালে কোম্পানির কাজের উদ্দেশে বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হন। গাড়ি চালাচ্ছিলেন তার ব্যক্তিগত চালক সাইফুল ইসলাম। অফিসের কাজ শেষে সাড়ে তিনটায় তিনি প্রাইভেটকারে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। ৪টায় তার স্ত্রী লুৎফুন নাহার তাকে ফোন করলে অপরপ্রান্ত থেকে কল কেটে দেওয়া হয়। পরে ইফতারের আগে লুৎফুন নাহার পুনরায় ফোন করেও স্বামীকে পাননি।
এরপর স্বামীর খোঁজ নেওয়ার জন্য চালক সাইফুলকে ফোন করেন তিনি। সাইফুল তাকে জানান, আহসান উল্লাহকে নিয়ে মিরপুরে অবস্থান করছেন। তার কাছে ফোন দিতে বললে, চালক বলেন- ‘স্যার মিটিং করছে।’ রাত ৮টায়ও বাসায় না ফেরায় আবার স্বামীকে ফোন করেন লুৎফুন নাহার। তখন ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর স্বামীর খোঁজে চালক সাইফুলকে ফোন করলে চালক জানান, আহসান উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। তাকে গাড়ি নিয়ে বাসায় চলে যেতে বলেছেন। রাতে তিনি বাসায় গাড়ি রেখে চলে যান।
বিভিন্ন স্থানে আহসানের সন্ধান শুরু করেন স্বজনরা; কিন্তু কোথায়ও না পেয়ে ভোরে তুরাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। সোমবার সকালেই চালক সাইফুল চন্ডালভোগ এলাকার ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। তার ফোন নম্বরও বন্ধ করে রাখেন। সোমবার সাইফুলকে আসামি করে আহসানের স্ত্রী লুৎফুন নাহার বাদী হয়ে অপহরণ মামলা করেন।
মঙ্গলবার বেলা ১২টায় খবর পাওয়া যায়, ১৬ নম্বর সেক্টরের কাশবনের ভেতরে অজ্ঞাত একজনের লাশ পড়ে আছে। অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধারের পর জানা যায়, এই ব্যক্তিই নিখোঁজ থাকা আহসান উল্লাহ। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।