Logo
Logo
×

জাতীয়

রোজা উপলক্ষ্যে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিলেও সুফল পাচ্ছে না ভোক্তা

Icon

ইয়াসিন রহমান

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৯:৪৮ এএম

রোজা উপলক্ষ্যে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিলেও সুফল পাচ্ছে না ভোক্তা

আসন্ন রোজা উপলক্ষ্যে নিত্যপণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকার থেকে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের ওপর বিভিন্ন ধরনের কর কমানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কর একেবারে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এলসি মার্জিন শিথিল করা হয়েছে। এলসির ক্ষেত্রে ন্যূনতম কমিশন রাখতে বলা হয়েছে। নিত্যপণ্য আমদানিতে ডলারের জোগান বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকের নির্ধারিত দামেই ডলার বিক্রি নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বন্দর থেকে পণ্য খালাস দ্রুত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম কমেছে। এমন অবস্থায় দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে কমার কথা, সেভাবে কমছে না। ফলে সরকারের যথাযথ তদারকির অভাবে নীতি সহায়তায় ছাড় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছছে না। উলটো লাভবান হচ্ছে ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী।

এদিকে ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, পণ্যের সরবরাহের কোনো কমতি নেই। তবে খুচরা দোকানগুলোয় সয়াবিন তেলের সংকট রয়েছে। সুপারশপসহ বড় দোকানগুলোয় ভোজ্যতেলের কোনো ঘাটতি নেই। চালের ভরা মৌসুম হলেও দাম বাড়ছে। নীতি সহায়তায় ছাড় দেওয়ার কারণে সব ধরনের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার কারণে টাকার অঙ্কে আমদানি কমলেও পরিমাণে বেড়েছে। এর প্রভাবেই বাজারে সরবরাহ বেশি। এরপরও যদি কারসাজির প্রমাণ মেলে তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকার থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। জরিমানার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার হুমকিও দেওয়া হয়। প্রয়োজনে অসাধুদের ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এসব কারণে অনেক পণ্যের দাম আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে নীতি সহায়তায় ব্যাপক ছাড়ের কারণে যে হারে পণ্যের দাম কমার কথা, সেভাবে কমছে না। এর জন্য সড়ক ও স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি এবং একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অতিমুনাফাকে দায়ী করা হচ্ছে। সম্প্রতি অর্থ ও স্বরাষ্ট্র-দুই উপদেষ্টাই পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম কমছে না।

সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেছেন, রমজানে পণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকবে। খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল থেকেও আরও নিম্নগামী থাকবে। খেজুর, ছোলা, ডালসহ প্রয়োজনীয় সব পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। সে প্রস্তুতিও আছে। তবে কারসাজি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেছেন, জানুয়ারি থেকে রমজাননির্ভর পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। মূল্য আরও ভোক্তাসহনীয় করতে সরকারের সংস্থাগুলোকে কঠোর তদারকি করতে হবে। গত কয়েক বছর রোজায় পণ্যের ঘাটতি না থাকলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারের এ বিষয়ে নজরদারি রাখতে হবে। তবে যেভাবে নীতি সহায়তায় ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেভাবে পণ্যের দাম কমেনি।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই পণ্যের দাম কমাতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেয়। এখন এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে যেভাবে করহার কমেছে, সেভাবে পণ্যের দাম কমছে না। ৭ নভেম্বর পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে প্রতি টনে আরোপিত শুল্ক ৬ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৪ হাজার টাকা করা হয়। ৯ অক্টোবর পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়, যা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ব্যাপক হারে শুল্ক কমানোর ফলে চিনির আমদানি বেড়েছে। ফলে বর্তমানে চিনির দাম কিছুটা কমেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা। এক মাস ও এক বছর আগে বিক্রি হয়েছিল ১৩০ টাকা কেজি। এ হিসাবে দাম কমেছে ৫ টাকা। তবে প্রতি কেজি চিনিতে শুল্ক কর কমেছে ১০ থেকে ১১ টাকা। এ হিসাবে চিনির দাম আরও কমার কথা। সব খাতের ছাড় সমন্বয় করলে চিনির মূল্য ১১০ থেকে ১১৫ টাকা হতে পারে।

১৭ অক্টোবর ডিম আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। এতে ডিমের আমদানি বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনও বেড়েছে। ফলে দামও কমেছে। প্রতি ডজন ডিম ২১০ টাকায় উঠেছিল। এখন তা কমে ১৩০ টাকায় নেমেছে। এক বছর আগে দাম ছিল ১৪৫ টাকা। এক মাস আগে ছিল ১৪০ টাকা। এর দাম আরও কমার কথা, কিন্তু কমেনি। দেশে প্রতি ডজন ডিমের উৎপাদন খরচ সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা। বিপণনসহ প্রতি ডজনে খরচ ২০ টাকা হতে পারে। এর মধ্যে ব্যবসায়ীদের মুনাফাসহ প্রতি ডজন ডিমের দাম ১১০ থেকে ১১৫ টাকা হতে পারে। ডিমের আমদানি খরচ আরও কম। ফলে সেগুলোর দামও কমছে না। তবে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ডিম ভেঙে যাওয়ার কারণে অপচয় খরচ বেশি। যে কারণে দাম কমছে না।

পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৫ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ এবং ৬ নভেম্বর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৫ শতাংশও প্রত্যহার করা হয়, যা ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল ছিল। এতে পেঁয়াজের আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনই দেশি পেঁয়াজও ইতোমধ্যে বাজারে এসেছে। ফলে দাম কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪৫ টাকা কেজি। এক বছর আগে ১২০ এবং এক মাস আগে ছিল ৫০-৭০ টাকা কেজি।

৫ সেপ্টেম্বর আলু আমদানিতে শুল্ক ২০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ফলে আলুর আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনই দেশি আলু বাজারে আসায় দামও কমেছে। প্রতি কেজি আলু এখন বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ টাকা। এর দাম গত আগস্টে সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় উঠেছিল। তবে এক বছর আগে ছিল ৩০ টাকা কেজি। এক মাস আগেও ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এ হিসাবে আলুর দাম বেশ কমেছে।

আসন্ন রমজান সামনে রেখে ২১ নভেম্বর খেজুর আমদানিতে মোট শুল্ক সাড়ে ৬২ থেকে কমিয়ে ৪১ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কায়ন মূল্য যৌক্তিক করা হয়, যা চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এতে খেজুরের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে আজওয়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা কেজি। এক মাস আগে ছিল ১ হাজার টাকা। গত রোজার আগে ছিল দেড় হাজার টাকা কেজি। এক বছরের ব্যবধানে কেজিতে দাম কমেছে ৬০০ টাকা।

গত বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরপর তিন দফা বন্যায় চালের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে এর দাম বেড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০ অক্টোবর চাল আমদানিতে মোট শুল্ক সাড়ে ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ শতাংশ করা হয়। ৩১ অক্টোবর সমূদয় শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে চাল আমদানিতে ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রয়েছে। এতে চালের আমদানি খরচ কমেছে। ফলে সরবরাহ বেড়েছে। দাম কিছুটা কমলেও এখনো গত বছরের তুলনায় বেশি রয়েছে। গত বছরের এ সময়ে মোটা চালের দাম ছিল ৫০ টাকা কেজি।

এক মাস আগে ছিল ৫৮ টাকা। এখন তা কমে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে দাম কমেছে ৩ টাকা। তবে এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৫ টাকা।

নাজিরশাইলের কেজি গত বছরের এ সময়ে ছিল ৭৫ টাকা। এক মাস আগে ছিল ৮৫ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৮২ টাকায়। এক বছরের হিসাবে দাম বেড়েছে ৭ টাকা, এক মাসের হিসাবে কমেছে ৩ টাকা। বাজারে সব ধরনের সবজির দাম কমেছে। টমেটো ২০-২৫, বেগুন ৩০, শিম ২০-২৫ ও শসা ৩০-৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

তবে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা রয়েই গেছে। ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় রাখতে গত ডিসেম্বরে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক ও অগ্রিম আয়কর শতভাগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। সব মিলে প্রতি লিটারে কর কমেছে ১৬ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু বাজারে না কমে বেড়েছে ১৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল গত বছরের এ সময়ে ছিল ১৬০ টাকা লিটার। এক মাস আগে ছিল ১৮৫ টাকা। এখন তা বেড়ে ২০০ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে। এক বছরে দাম বেড়েছে ৪০ টাকা। এক মাসে বেড়েছে ১৫ টাকা। বোতলজাত সয়াবিনের দামও বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, কোম্পানিগুলো বাজারে তেল সরবরাহ করছে না। যেজন্য তেলের সংকট দেখা দিয়েছে।

রোজার পণ্য আমদানিতে যখন কোম্পানিগুলো এলসি খুলেছিল, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। ফলে দাম আরও কমার কথা। কিন্তু কমছে না। উলটো বাজার থেকে তেল উধাও করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় দাম আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টা করছে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিল মালিকরা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান বলেন, তেলের ক্ষেত্রে ৬টি রিফাইন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। ৩-৪ মাস ধরে তেল নিয়ে বাজারে অস্থিরতা চলছে। প্রতিদিন তেলের উৎপাদন কত, কোম্পানিগুলোকে তা দৈনিক ভোক্তা অধিদপ্তরকে জানাতে হবে। পাশাপাশি বর্তমানে যে পরিমাণ রিফাইন হচ্ছে, তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করতে হবে।

টিকে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তসলিম বলেন, দেশের বাইরে থেকে সয়াবিন আসতে ৫০-৬০ দিন এবং পাম তেল ১০-১২ দিন সময় লাগে। বর্তমানে সবাই গতানুগতিক সরবরাহ করছে। এমনকি সরকারি দরের চেয়ে ১৫ টাকা কম দামে পাম তেল বিক্রি হচ্ছে। রোজা উপলক্ষ্যে টিকে দ্বিগুণ এলসি করেছে। সেপ্টেম্বরের এলসি অক্টোবরে করা হয়েছে। এসব ডিসেম্বরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ব্রাজিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তা দেরি হয়েছে।

রোজায় ছোলার চাহিদা বেশি থাকে। যে কারণে দামও বাড়ে। নভেম্বরে ছোলার কেজি ১১০ থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা হয়। পরে ২০ টাকা কমে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। কেজিপ্রতি ২০ টাকা কমলেও এখনো ১০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে গত রোজার আগে প্রতি কেজি ছোলা ছিল ১৩০ টাকা। এক বছরের হিসাবে কেজিতে ১০ টাকা কমেছে। মসুর ডাল গত বছরের মতো এবারও ১১০-১৪০ টাকা কেজি।

প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা। গত রোজার আগে ছিল ৭০০-৭৫০ টাকা। এ হিসাবে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা। এক মাস আগে ছিল ২১০ টাকা। গত রোজার আগে ছিল ২০০ টাকা। কমতে শুরু করেছে খেজুর ও সব ধরনের ফলের দাম। ৫ কেজি প্যাকেটজাত আজওয়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। এক মাস আগে ছিল ৫ হাজার টাকা। দেশি ফলের দামও তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।

ঘটনাপ্রবাহ: বাজার দর


আরও পড়ুন

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম