
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০১:৩১ এএম
যেভাবে পবিত্র রমজান উদযাপন করেন মালয়েশিয়ার মুসলিমরা
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৫, ০৭:৩০ পিএম

বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুসারে রমজান পালন করেন। প্রতিটি সম্প্রদায় অনন্য রীতি ও প্রথার মাধ্যমে এই মাসকে স্বাগত জানায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার মুসলমানরাও এর ব্যতিক্রম নয়।
দেশটির জনগণের ৬১ শতাংশের বেশি মুসলিম। সেখানে পবিত্র রমজান মাস উদযাপিত হচ্ছে নানা আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে। যেমন- বর্ণিল পোশাক পরা, সম্মিলিত নামাজ আদায় এবং রমজানের বিশেষ বাজার স্থাপনের মাধ্যমে।
রমজান শুরু হয় মূলত চাঁদ দেখার মাধ্যমে। যা পালন করা হয় আত্মসংযম, দানশীলতা, উদারতা ও নামাজ আদায়ের মাধ্যমে। এ সময় মুসলিমরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন এবং ধূমপান, পরনিন্দা ও বিতর্ক এড়িয়ে চলেন। তবে রমজানের রাতগুলোই হয়ে ওঠে মূল উৎসবের সময়।
মালয়েশিয়ায় রমজানের বিশেষতা
মালয়েশিয়ার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় এই মাসটি তাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো এখানেও প্রতিদিনের রোজা ইফতারের মাধ্যমে শেষ হয়। দেশটিতে যা ‘বেরবুকা পুয়াসা’ নামে পরিচিত।
উষ্ণ আবহাওয়ায় রোজা রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও মালয়েশিয়ার রমজানের উৎসবমুখর পরিবেশ রোজাকে উপভোগ্য করে তোলে। দেশটির মেলাকা, জোহর এবং কেদাহ রাজ্যে রমজানের প্রথম দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া কর্মস্থলগুলো এই মাসে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। যাতে সবাই ঘরে ফিরে ইফতারের প্রস্তুতি নিতে পারেন।
রমজান মাস শুরু হলে, শহরের প্রধান সড়কগুলো পরিষ্কার করা হয়, মসজিদ ও সড়কগুলো সাজানো হয় লাইটিং ও বিভিন্ন আলোকসজ্জায়। মুসলিমরা একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং দোকানগুলোতে ‘রমজান মুবারক’ লেখা ব্যানার ঝুলতে দেখা যায়।
রমজানের বাজার ও রাতে খাবারের উৎসব
মালয়েশিয়ায় রমজান মাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো- দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রমজানের বিশেষ বাজারগুলো। এসব বাজারে নানা ধরনের সুস্বাদু ইফতার সামগ্রী পাওয়া যায়।
মালয়েশিয়ার মানুষ রমজানের এই বাজারকে খুব ভালোবাসে। এখানে পাওয়া যায় নাসি কেরাবু, পুলুত পাঙ্গাং-এর মতো স্থানীয় বিশেষ খাবার ও পানীয়। যা সারা বছর সাধারণত পাওয়া যায় না।
সন্ধ্যার পর নৈশবাজারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে সাশ্রয়ী মূল্যের স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক সমুদ্রসৈকতে, বিশেষ করে বাতু বুরুক বিচে, সেহরির জন্য বিভিন্ন দোকান খোলা থাকে। সেখানে লোকজন পিকনিকের আমেজে রাতের খাবার উপভোগ করে।
রমজানের বাজারগুলো শুধু মুসলিমদের জন্যই নয়; অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও এখানে এসে খাবার কিনে থাকেন। কারণ এসব খাবারের অনেকগুলোই কেবল রমজান মাসেই পাওয়া যায়।
ঐতিহ্যবাহী খাবার: বুবুর লামবুক
মালয়েশিয়ায় রমজানের অন্যতম বিশেষ খাবার হলো বুবুর লামবুক। যা নারকেলের দুধ, মাংস, মশলা ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ খিচুড়ির মতো খাবার। এটি ইফতারের জন্য বেশ ভারি একটা খাবার এবং সাধারণত বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।
প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের আগে মসজিদ চত্বরে বুবুর লামবুক বিতরণের দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া রমজান মাসে মসজিদগুলোতে প্রচুর দান-অনুদান আসে, যা দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
মালয়েশিয়ায় রমজান প্রতিযোগিতা ও ঈদ উদযাপন
এছাড়াও রমজান মাসে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যেমন- আধুনিক ফিকহ ও কুরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা। এতে বিজয়ীদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে। যা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দিয়ে থাকেন।
রমজানের শেষ ১০ দিনে বহু মুসলিম মসজিদে ইতিকাফে বসেন। এ সময় তাদের জন্য পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়।
এছাড়া ঈদের কয়েকদিন আগে যুব সম্প্রদায় মসজিদে ‘যাকাত’ সংগ্রহ করে, যা গরিবদের মাঝে বিতরণ করা হয়। যাতে সবাই ঈদ আনন্দে সামিল হতে পারেন।
মালয়েশিয়ায় ঈদুল ফিতর
রমজানের শেষ রাতে দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা নতুন চাঁদ দেখার জন্য বাইরে যান। আর চাঁদ দেখা গেলে জাতীয় টেলিভিশনে ঈদের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ঈদের দিন পুরুষরা বাজু মেলায়ু এবং নারীরা বাজু কুরুং পরিধান করেন। মালয়েশিয়ায় ঈদে ‘ওপেন হাউস’ এর প্রচলন রয়েছে। যেখানে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একে অপরের বাড়িতে গিয়ে উৎসব উপভোগ করেন।
ঈদের আগে অনেক পরিবার নতুন পর্দা সেলাই করে, ঘরদোর সাজায় এবং নতুন পোশাক কেনে।
ঈদের সকালে সবাই নতুন পোশাক পরে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান, আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং পরিবারের বড়দের কাছে ক্ষমা ও দোয়া চান।
রমজান ও ঈদের এই উৎসবমুখর পরিবেশ মালয়েশিয়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
সূত্র: মেহের নিউজ