
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০১:৫১ পিএম
কেমন ছিল সুলতানি ও মোগল আমলের ঈদ ঐতিহ্য

যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৫, ০২:০৯ পিএম

সম্মিলিতভাবে ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বাণিজ্য মেলার পুরাতন মাঠে অনুষ্ঠিত হবে ঈদ জামাত। সুলতানি আমলের মতো ঈদ আনন্দ মিছিলের পাশাপাশি থাকবে ঈদ মেলা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সম্প্রতি এ ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, সুলতানি আমলের ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবারের ঈদ নতুনভাবে উদযাপিত হোক। শুধু ব্যক্তি কিংবা পরিবার কেন্দ্রিক ঈদ আনন্দ না হয়ে, এবারের ঈদটা কাটুক সমবেতভাবে।
জামাত শেষে ঈদকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা উল্লেখ করেন তিনি বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে এবার সারা দেশে একযোগে এই ঈদ আনন্দ র্যালি, মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব না হলেও আগামীতে সারা দেশে একযোগে এমন ঈদ আনন্দ উদ্যাপন করা হবে।
কেমন ছিল সুলতানি ও মোগল আমলের ঈদ মিছিল?
১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও নামাজ, রোজা ও ঈদ উদ্যাপনের প্রচলন হয় তার বেশ আগে থেকেই।তবে ঘটা করে ঈদ পালনের রীতি শুরু হয় স্বাধীন সুলতানি আমলে।
ধারণা করা হয়, সেই আমলেই প্রথম ঢাকা শহরে উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন শুরু হয়। তখন কৃষিনির্ভর গ্রামবাংলায় বসবাসকারী মুসলমানরা যার যার সাধ্য অনুযায়ী ঈদের আনন্দে মেতে উঠত। ইবাদত, খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ-উৎসব—সবই ছিল তাতে।
তাদের এই আয়োজনে ভিন্ন ধর্মের লোকজনও শামিল হতো। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে আনন্দ ভাগাভাগি হতো। তবে তখনকার সময়ে সাধারণ মানুষের ঈদ আয়োজন এত ব্যয়বহুল ছিল না।
ঐতিহাসিকদের মতে, পরবর্তী সময়ে বঙ্গদেশে ঈদ উদযাপনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে মোগলরা।
মোগলদের সময় ঈদ উদযাপনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ঈদ মিছিল। রাজধানীতে ঈদের দিন মোগল সম্রাটরা নামাজ পড়তে যেতেন মিছিল করে। মোগলাই জৌলুস প্রকাশিত হতো সেই ঈদ মিছিলে।
সেই ধারাবাহিকতায় বলা যেতে পারে, মোগলরা আসার আগে এই অঞ্চলে, মানে পূর্ববঙ্গে ঈদ ‘উৎসব’ হয়ে ওঠেনি। মোগল রাজধানী আগ্রা থেকে এত দূরে উৎসব করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চাইতেন না মোগলরা। ১৬১০ সালের পর থেকে আগ্রার অনুকরণে এখানকার ঈদ উদযাপনটা হয়ে ওঠে জাঁকজমকপূর্ণ।
মোগলদের ঈদ উদযাপন হতো দু-তিনদিন ধরে। চলত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন। আত্নীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন নিয়ে একরকম মেলাই বসে যেতো। তখনকার ঈদ উদযাপনের চিত্র পাওয়া যায় সেই সময়কার সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতির সেনাপতি মির্জা নাথানের বর্ণনা থেকে।
সন্ধ্যায় যখন মোমবাতির আলোয় আলোকিত হতো মোগল আমলের ঢাকা শহর, তখনও শেষ রোজার সন্ধ্যাকাশে উঠতো ঈদের চাঁদ। শিবিরে বেজে উঠতো শাহী তূর্য (রণশিঙ্গা) এবং গোলন্দাজ বাহিনী গুলির মতো একের পর এক ছুঁড়তে থাকতো আতশবাজি। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো এই আতশবাজির খেলা। শেষরাতের দিকে বড় কামান দাগা হতো।
মির্জা নাথানের স্মৃতিকথায় মোগলদের ঈদ উদযাপনের বর্ণনা থাকলেও ঈদ মিছিলের কোনো কথা আমরা পাই না। কিন্তু এটা মাথায় রাখতে হবে, ঢাকার তৎকালীন সুবাদার ইসলাম খাঁ নিজের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সেই সময়কার ক্ষমতাসীন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরকে অনুসরণ করতেন, যদিও সেটা সম্রাট পছন্দ করতেন না।
কিন্তু সম্রাট এবং সুবাদারের শৈশবটা একসঙ্গে কাটার সুযোগটা ইসলাম খাঁ ভালোভাবেই নিতেন। আর সেই ধারাবাহিকতায় ধরে নেওয়াটা একেবারে অযৌক্তিক হবে না যে, ঢাকার ঈদ মিছিলের শুরুটা তিনি করলেও করতে পারেন। তবে সেটা বেশি দিন চলেনি। ১৬১৩ সালে তার অকাল মৃত্যুর পর ঢাকায় ঈদ মিছিলের চলটা বোধহয় সেভাবে টিকেনি।
দুইজন মোগল যুবরাজ আজম শাহ (১৬৭৮-১৬৭৯) ও আজিম-উদ-দীন (১৬৯৮-১৭১২) সুবাদার হিসেবে ঢাকায় বাস করলেও তাঁদের সময়েও ঈদ মিছিল হতো কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েই যায়। কেননা তাদের সময়কার মোগল সম্রাট ছিলেন আওরঙ্গজেব। তিনি সম্রাট থাকাকালীন (১৬৫৮-১৭০৭) মোগলদের ঈদুল ফিতর পালনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসে।
তিনি পূর্ব পুরুষদের ঈদ উদযাপনের রীতি থেকে বের হয়ে আসেন। তার কঠোর অনুশাসনের বাইরে গিয়ে কারো কিছু করার সাহস ছিল না। আর তাই ধরে নিতে পারি, সেই সময়ে ঢাকাতেও ঈদ মিছিল হতো না। তবে তার মৃত্যুর পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছিল।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর মোগল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। তা সত্ত্বেও ঈদ মোটামুটি বেশ ঘটা করেই আয়োজিত হতো। সেই সময় ঢাকার শাসক নায়েব নাযিমদের (তৎকালীন বাংলার নবাবদের শাসন প্রতিনিধি) পৃষ্টপোষকতায় ‘ঈদ’ তখনো উৎসবের আমেজটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
এক কথায় বলা যায় যে, মোগল ঢাকার উজ্জ্বল সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে পারতো এই ঈদ উৎসব। এভাবে চলতে থাকলেও ঢাকার উপর মূল ধাক্কা এসে লাগে ১৭৬৫ সালে। সে বছর মোগল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের ভার পায় ইংরেজরা।
ঢাকার নায়েব-নাযিমরা পরিণত হন ক্ষমতাহীন শাসকে। পড়তি ঢাকার জৌলুস ধরার চেষ্টা করা হতো ঈদ ও মহরমের মিছিলের মাধ্যমে। এই মিছিলগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নায়েব-নাযিমরা।
শিয়া মতাবলম্বী হওয়ায় নায়েব-নাযিমরা ঈদের পাশাপাশি মহরমেরও মিছিল বের করতেন।
ধারণা করা হয়, নিজেদের শৌর্য দেখানোর জন্য উনিশ শতকের প্রথম দিকে এ মিছিলগুলোর ছবি আঁকার ব্যবস্থা করেছিলেন ঢাকার জনপ্রিয় নায়েব-নাযিম নুসরত জঙ্গ (১৭৮৫-১৮২২)। আর ছবিগুলো এঁকেছিলেন আলম মুসাওয়ার নামের এক শিল্পী। মোট ৩৯টি ছবি আঁকেন তিনি।
হাতে তৈরি বড় আকারের কাগজে (২২ ইঞ্চি থেকে ২৮ ইঞ্চি) ছবিগুলো এঁকেছেন আলম মুসাওয়ার, যা অন্যান্য মোগল মিনিয়েচারের তুলনায় কিছুটা বড়। তার অঙ্কনশৈলী হচ্ছে মোগল ও কোম্পানি আর্টের মিশেল। দেশীয় রঙের ব্যবহার করলেও ইউরোপীয় চিত্রকলার কিছু বৈশিষ্ট্য তার কাজে লক্ষ্য করা যায়।
জলরঙে আঁকা এই মূল্যবান চিত্রকর্মগুলো বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে, যা ঢাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অমূল্য অংশ।
চিত্রগুলোতে দেখা যায়, ঈদের মিছিলগুলো নায়েব-নাযিমদের নিমতলী প্রাসাদ (বর্তমানে নিমতলী এলাকা), চকবাজার, হোসনি দালান প্রভৃতি স্থাপনার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। মিছিলে থাকতো সজ্জিত হাতি, ঘোড়া, পালকি, অস্ত্র হাতে সৈন্যদল।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কারো কারো হাতে থাকতো রং-বেরংয়ের ছাতা অথবা বাদ্যযন্ত্র। নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে নায়েব-নাযিমরা থাকতেন একেবারে সামনের দিকে। সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি ঢাকার অভিজাত শ্রেণির লোকজনসহ থাকতেন ঢাকায় অবস্থানকারী ইউরোপীয়রাও।
তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে