
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০২:১৬ পিএম
কাশ্মীরে ছুটি কাটাতে চেয়েও অনুমতি পাননি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৫, ০৬:২৭ পিএম

আরও পড়ুন
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগের পর ভারতে যোগ দিয়েছিলো এমন ছোট রাজ্যের সংখ্যা ছিল পাঁচশ'য়েরও বেশি। তবে তিনটি রাজ্য হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর দেশ ভাগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কার সঙ্গে থাকবে।
হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড় ছাড়াও কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তানের সীমান্তে পড়েছে। সে সময় কাশ্মীরের মোট আয়তন ছিল ৮৪ হাজার ৪৭১ বর্গমাইল এবং সেদিক থেকে হায়দ্রাবাদের চেয়েও বড় রাজ্য ছিল কাশ্মীর। তবে এর জনসংখ্যা ছিল মাত্র চার মিলিয়ন।
কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক ছিলেন রাজা হরি সিং যিনি ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিংহাসনে আরোহন করেন।
জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি মুম্বাইয়ের রেসকোর্সে এবং তার রাজ্যের বিস্তীর্ণ গহীন বনে শিকার করেই কাটিয়ে দেন।
দেশভাগের পরে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ না দেওয়ার চিন্তা রাজা হরি সিং-এর মনে শেকড় গেড়েছিল।
লেখক রামচন্দ্র গুহ তার ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী বইয়ে লিখেছেন, হরি সিং কংগ্রেসকে ঘৃণা করতেন। তাই ভারতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবতেও পারেননি। কিন্তু পাকিস্তানে যোগ দিলে তার হিন্দু পরিবারের ভাগ্যের সূর্য যে চিরতরে নিভে যাবে এ বিষয়েও চিন্তিত ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হওয়ায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আশা করেছিলেন যে কাশ্মীর ‘পাকা ফলের মতো টুপ করে তার কোলে পড়বে’।
কিন্তু জিন্নাহর এই আশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারেনি। মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে সমঝোতার দীর্ঘ আলোচনায় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
ফুসফুসের রোগে দুর্বল হয়ে পড়েছিল তার শরীর।
ফলে তিনি কাশ্মীরে কিছুদিন বিশ্রাম কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে সেক্রেটারি উইলিয়াম বার্নিকে কাশ্মীরে যাওয়ার নির্দেশ দেন জিন্নাহ।
বিশ্ববিখ্যাত লেখক ডমিনিক ল্যাপিয়ের এবং ল্যারি কলিন্স তাদের বই ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ এ লিখেছেন, ব্রিটিশ সেক্রেটারি পাঁচ থেকে সাত দিন পরে ফিরে আসলে জিন্নাহ হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
কারণ মহারাজা হরি সিং চাননি ছুটি কাটাতেও জিন্নাহ তার এলাকায় পা রাখুক।
তিনি আরও লিখেছেন, তার এ জবাব পাকিস্তানের শাসককে প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কাশ্মীরের অগ্রগতি তার মনের মতো হচ্ছে না।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী একটি বৈঠক ডাকেন।
মহারাজাকে পাকিস্তানে যোগ দিতে কীভাবে বাধ্য করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই বৈঠকটি ডাকা হয়েছিল।
পাঠান আদিবাসীদের অস্ত্রসহ কাশ্মীরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল বৈঠকে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর আগা হুমায়ুন আমিন তার '১৯৪৭-৪৮ কাশ্মীর ওয়্যার: দ্যা ওয়ার অব লস্ট অপোরচুনিটিজ' বইতে লিখেছেন, নিয়মিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন মেজর, একজন ক্যাপ্টেন এবং দশজন কমিশনপ্রাপ্ত জুনিয়র কর্মকর্তা নিয়ে প্রতিটি ইউনিট গঠিত।
তিনি লিখেছেন, পাঠানদের মধ্য থেকে তাদের (সেনাবাহিনীর সদস্যরা) বাছাই করা হয়েছিল এবং তারা আদিবাসীদের মতো পোশাক পরেছিল।
আদিবাসী বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার জন্য লরি ও পেট্রোলের ব্যবস্থাও করেছিল পাকিস্তান।
তিনি আরও লিখেছেন, যদিও নেতৃত্বে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা ছিলেন, আদিবাসীরা আধুনিক কৌশলের সাথে যেমন পরিচিত ছিল না, তেমনি শৃঙ্খলাবদ্ধও ছিল না।
১৯৪২ সালের ২২শে অক্টোবর রাতে একটি পুরোনো ফোর্ড স্টেশন ওয়াগন লাইট বন্ধ করে ঝিলাম নদীর সেতু থেকে প্রায় একশ গজ দূরে থেমে যায়।
তার পেছনে ছিল ট্রাকের লম্বা লাইন। প্রতিটি ট্রাকে অল্প কয়েকজন মানুষ নীরবে বসে ছিল।
ল্যাপিয়ের এবং কলিন্স লিখেছেন, স্টেশন ওয়াগনে বসে থাকা লোকেরা হঠাৎ দেখতে পেলো, রাতের অন্ধকার আকাশে আগুনের শিখা জ্বলছে এবং ধনুকের মতো একটি অবয়ব তৈরি হয়েছে।
সেতুর ওপারে মহারাজার মুসলিম সৈন্য যারা বিদ্রোহ করেছিল তাদের একটি সংকেত ছিল এটি। তারা শ্রীনগরের টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছিল এবং সেতুতে অবস্থানরত প্রহরীদের বন্দি করেছিল।
তিনি আরও লিখেছেন, স্টেশন ওয়াগনের চালক তার গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে ব্রিজ পার হয়ে যায়। শুরু হয়েছিল কাশ্মীর যুদ্ধ।
তবে, আদিবাসীদের জন্য শ্রীনগরের পথ খোলা ছিল। ১৩৫ মাইলের দীর্ঘ এই রাস্তায় কোন পাহারা বা নজরদারির ব্যবস্থা ছিল না।
আদিবাসীদের পরিকল্পনা ছিল, সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মহারাজা হরি সিংয়ের ঘুমন্ত রাজধানীর ওপর আক্রমণ করবে তারা।
যখন সৈরব হায়াত খান আদিবাসীদের নিয়ে শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন তখন তিনি দেখতে পান তার সেনাবাহিনী সেখান থেকে নিখোঁজ।
পরে একটি সাক্ষাৎকারে সৈরব হায়াত খান ঘটনাটি স্মরণ করে বলেন, মুজাফফরাবাদের হিন্দু বাজারে এক রাতে আক্রমণের মাধ্যমে কাশ্মীরি ভাইদের মুক্ত করার জন্য তার জিহাদ শুরু হয়েছিল।
আমরা তাদের থামানোর চেষ্টা করেছি। বুঝিয়েছি আমাদের শ্রীনগর যেতে হবে। কিন্তু কেউ শোনেনি।
এর ফলাফল হলো পরবর্তী ৭৫ মাইল অতিক্রম করতে আমাদের ৪৮ ঘণ্টা লেগেছিল।