পাসপোর্ট : নাগরিক অধিকার ও নিঃস্বার্থ সেবার আনন্দ

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৫’-এ পাসপোর্টবিষয়ক বক্তব্যটি আমার কাছে হৃদয়গ্রাহী মনে হয়েছে। আমাদের সমাজজীবনে হোক কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে, যাদের হাতে কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা থাকে, তারা যে কোনো সমস্যার মূল কারণ সমূলে উৎপাটনের চেয়ে বরং ‘কিছু একটা করেছে’-তা দেখানোতেই বেশি আগ্রহী থাকে।
এর ফলে অস্থায়ী সমাধানের কারণে একই সমস্যা বারবার দেখা দেয়। সেই হিসাবে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৫’-এ পাসপোর্ট ইস্যুতে নেওয়া সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পাসপোর্ট ইস্যুতে তিনি বলেছেন, ‘আমাকে যে জন্মসনদ দিয়েছেন, সেটা কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন দিয়ে করেননি।
আমাকে এনআইডি দিয়েছেন-তার জন্য কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। এ দেশের নাগরিক হিসাবে পেয়েছি। পাসপোর্টও এ দেশের নাগরিকের একটা পরিচয়পত্র। এখানে পুলিশ ভেরিফিকেশন কেন লাগবে? আজ থেকে পাসপোর্ট করতে কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে না। কারণ এটিও এ দেশের মানুষের নাগরিক অধিকার।’
একজন ব্যক্তি যখন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন, তখন ইতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আবেদনকারীকে সেই পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। বিদ্যমান পদ্ধতিতে একটি সাধারণ পাসপোর্ট ১২ কর্মদিবস ও এক্সপ্রেস ডেলিভারির ক্ষেত্রে তিন কর্মদিবসের মধ্যে দেওয়ার নিয়ম।
কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন যথাসময়ে না পাওয়ার কারণে বা পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় অনাবশ্যক কাগজপত্র যাচাইয়ের কারণে আবেদনকারীকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য পুলিশকে কিছু টাকা দেওয়া জনগণের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। শুধু তাই নয়, কিছু টাকার বিনিময়ে একই ব্যক্তির নামে ওই ব্যক্তির অগোচরেই পাসপোর্ট করা বেশকিছু চক্রের জন্য ছিল সহজ ব্যাপার।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল; কিন্তু তখনো বাধা দিয়েছিল এসবি তথা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ। অবশেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ উদ্যোগের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের জীবনকে সহজ করে দিলেন। প্রকৃত নেতা, প্রকৃত মানুষ এভাবেই জনগণের কল্যাণের কথা বলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি কেবল এ ইভেন্টের অধিনায়ক নন, তিনি বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশের অধিনায়ক।
আমরা আশাবাদী, তিনি তার মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এভাবেই জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এবার একটু আমার একটি পাসপোর্ট বিষয়ক রোমন্থিত স্মৃতিতে ফেরা যাক। পাসপোর্ট ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অধিদপ্তর। সাল ২০০৪। আমি তখন প্রেষণে এনএসআইতে যুক্ত। ওই সময়ে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ চারদিকে প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতির রাজ্য গড়ে উঠেছিল।
সেই সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের নেতৃত্বে প্রায়ই এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আলোচনা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় একদিন তৎকালীন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জাতীয় কমিটিতে পাসপোর্ট সম্পর্কে ব্রিফিং করছিলেন। যেহেতু আমিও তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলাম, তাই আমার ওপরও বেশকিছু সংস্থার প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব ছিল।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক সেই মিটিংয়ে বলেছিলেন, এখন কেউ অবৈধভাবে পাসপোর্ট তৈরি করতে পারেন না, সিস্টেমকে আপডেটেড করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, কোনো এজেন্টও (দালাল) এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে না এবং নিখুঁত পুলিশ যাচাইকরণ ছাড়া কেউ অবৈধভাবে পাসপোর্ট তৈরি করতে পারবে না। যেহেতু তখন আমি একজন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলাম, তাই আমি তাদের বক্তব্যের বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলাম যে, এখনো পাসপোর্ট তৈরিতে অহেতুক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
অনেক দরিদ্র মানুষ, যারা রোজগারের জন্য একটু ভালো জীবন পরিচালনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ছোটখাটো কাজের জন্য যাচ্ছে, তাদেরকে স্থানীয় বিভিন্ন দালালচক্রসহ পুলিশের কাছেও ভেরিফিকেশনে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি অবৈধ পাসপোর্ট তৈরি হচ্ছে। তখন আমার বক্তব্য শুনে তৎকালীন পাসপোর্ট মহাপরিচালক ও স্বরাষ্ট্র সচিব আমার ওপর বিরক্ত হন। অতঃপর পরের সভায় আমার যুক্তি যে সঠিক ছিল তা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে প্রমাণস্বরূপ আমি চারটি নতুন পাসপোর্ট নিয়ে হাজির হই। পাঠকদের মনে নিশ্চয় প্রশ্ন জাগছে, পাসপোর্ট চারটি কেন আর কাদের? সেই চারটি পাসপোর্ট ছিল তৎকালীন পাসপোর্ট মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং তৎকালীন কোস্টগার্ডের পরিচালক ফরিদ হাবিবের, যিনি উভয় সভায় উপস্থিত ছিলেন (পরবর্তীকালে নেভিপ্রধান হয়েছিলেন)।
সেসময়ে পাসপোর্টগুলো তৈরি করতে আমার প্রায় বিশ-বাইশ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল, যা এখনো আমাকে পরিশোধ করা হয়নি। এই হলো পাসপোর্টবিষয়ক আমার নিজের অভিজ্ঞতা। এ গল্পটি শেয়ারের মূল উদ্দেশ্য হলো আমরা মুখে যতটা বলি, প্রকৃতপক্ষে আমাদের নিজেদের পেশাদারত্বে আমরা যে যার অবস্থান থেকে সৎ নই। সরকারের সব পরিষেবা প্রদানকারী অফিসের চিত্র একই।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে আরও একটি কথা বলেছেন, তা হলো, ‘সরকার সবসময় সাধারণ মানুষের হয়রানির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতি এবার উলটে দিতে হবে।’ আমি সামরিক বাহিনীর সদস্য থাকা অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ এরকম অনেক অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, অনেক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছে। নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, সরকারের সব পরিষেবা প্রদানকারী অফিসে নিুলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে : ১. আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ২. হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা জোরদার করা, ৩. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ৪. কারও বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের জোরালো প্রমাণ পেলে অনতিবিলম্বে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলি। লি কুয়ান ইউয়ের নাম কমবেশি আমরা সবাই জানি। একসময় ১২০টি জেলে সম্প্রদায়ের দেশ ছিল সিঙ্গাপুর। প্রাকৃতিক সম্পদহীন, বিধ্বস্ত দেশটিকে টিকিয়ে রাখা সেই সময়ে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ ছিল। ক্ষমতাগ্রহণের পর সিঙ্গাপুরকে গঠন করার ক্ষেত্রে সবার আগে যেটাতে লি কুয়ান ফোকাস করেছিলেন তা হলো, দেশটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা। দূরদর্শী এই নেতা প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন-বিশৃঙ্খল ওই দেশকে সঠিক রাস্তায় আনতে হলে দ্রুত সময়ে কঠোর আইন প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, দুর্নীতি থাকলে দেশের কোনো উন্নয়নই সম্ভব নয়। তাই আইনের কড়াকড়ি সিঙ্গাপুরে প্রবল। আইন না মানা বা অমান্য করার সুযোগ কারও নেই। আইনের প্রশ্নে কারও কোনো ছাড় নেই।
একটি জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত আলোকপাত করা যাক। লি কুয়ান ইউয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তেহ চেয়াং ওয়ান, তাকে দেওয়া হয়েছিল মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মন্ত্রী থাকাকালীন তেহ চেয়াং ওয়ানের বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। যেহেতু তিনি লি কুয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, তাই তিনি লি কুয়ানকে অনুরোধ করেন, তদন্তের সময় যেন তার ক্ষেত্রে একটু নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়। আমাদের দেশ হলে তদন্ত পর্যন্ত ব্যাপারটা যেত কিনা অথবা গেলেও রিপোর্ট কী আসত, সে বিষয়ে আমরা সবাই মোটামুটি ধারণা রাখি।
কিন্তু বন্ধুর দেওয়া প্রস্তাবে লি কুয়ানের উত্তরটা এমন ছিল : তিনি স্পষ্ট ভাষায় তার বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘তদন্ত সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপ করা তার পক্ষে সম্ভব না। যাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাকে সেই দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে সিস্টেম ভেঙে পড়বে। আর সিস্টেম একবার ভেঙে পড়লে সিঙ্গাপুর সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না। তখন তেহ চুয়াং ওয়ান ১৯৮৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিজের অপরাধ স্বীকার করে সুইসাইড নোট লিখে নিজেই নিজের সর্বোচ্চ শাস্তি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
প্রিয় বন্ধুর এভাবে চলে যাওয়ায় বেদনাসিক্ত হলেও লি কুয়ান তার শোকবাণীতে বলেছিলেন, ‘দেশের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে মন্ত্রী হলেই কারও আইন, বিচার বা তদন্ত প্রক্রিয়ার বাইরে থাকার অধিকার তৈরি করা উচিত নয়। তেহ চুয়াং ওয়ানের প্রতি নমনীয়তা দেখালে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ত। তাতে হয়তো তার জীবন কিছুটা দীর্ঘ হতো; কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ত সিঙ্গাপুরের শাসনব্যবস্থা।’
ব্যক্তির প্রতি আবেগ বা ভালোবাসা না দেখিয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছিলেন বলেই ছোট্ট দেশ হয়েও লি কুয়ানের সিঙ্গাপুর বড় দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে। এ মুহূর্তে আমাদেরও দরকার লি কুয়ানদের, যারা কিনা সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিস্বার্থকে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখবে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ দুর্নীতির এক চরম পর্যায়ে অবস্থান করছে। রাষ্ট্রের নিুপর্যায় থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি সেক্টরের অধিকাংশ মানুষ করাপ্টেড। দুর্নীতি ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে গেছে। দুর্নীতি দমন করা বাংলাদেশে বড়ই চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। এ মুহূর্তে ৯০ শতাংশ মানুষকে বদলানো সম্ভব নয়; কিন্তু আমরা চাইলেই বাস্তবমুখী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি; পারি লি কুয়ান ইউদের খুঁজে বের করতে। তার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা।
এ মুহূর্তে আমাদের প্রতিটি সেক্টরে সিস্টেম মনিটরিংয়ের জন্য এমন কিছু সৎ, দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, যারা কিনা সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দেশ এবং দেশের মানুষকে প্রাধান্য দেবে। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছাত্র প্রতিনিধি যুক্ত করা যেতে পারে। আমরা যদি এমন মানুষদের দায়িত্বে রেখে কঠোরভাবে প্রতিটি সেক্টরে মনিটরিং করাতে পারি এবং প্রতিটি সেক্টরে অপরাধীকে হাতেনাতে ধরে দ্রুত সময়ের মধ্যে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই একটি স্ট্যাবল পর্যায়ে আমরা পৌঁছতে পারব বলে শতভাগ আশাবাদী।
‘উপদেশ অপেক্ষা দৃষ্টান্ত শ্রেয়’, তাই কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে তা দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং সর্বোপরি জনমনেও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। শুধু তারাই জীবনে সত্যিকারের আনন্দ অনুভব করতে পারে, যারা আন্তরিক ও জনকল্যাণে নিঃস্বার্থ অবদান রাখতে পারে।
কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.) : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান; উপ-উপাচার্য, বিইউপি