Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

বর্ধিত সভায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান

জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিন

জনগণের সঙ্গে থাকুন, আচরণে আরও সংযত হন, শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের প্রশ্রয় দেব না, সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকুন * বিএনপি ক্ষমতায় গেলে গণহত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করবে * সরকারের প্রতি আহ্বান-নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করুন; স্থানীয় নির্বাচনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসুন

Icon

যুগান্তর প্রতিদেন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিন

জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, সর্বস্তরের প্রতিটি নেতাকর্মীকে আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আচরণ-আচরণে হতে হবে আরও সতর্ক এবং সংযত। যারা দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণ হবেন ব্যক্তির চেয়ে দলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমাকে বাধ্য হয়েই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে, নিতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়-এমন কোনো কাজকে বিএনপি বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেবে না। জনগণই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। বিএনপি জনগণকে বিশ্বাস করে। জনগণও বিএনপিকে বিশ্বাস করে। সুতরাং আপনাদের (নেতাকর্মী) প্রতি বিএনপির প্রতি জনগণের এই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে জনগণের সঙ্গে থাকুন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে দলটির বর্ধিত সভার প্রথম অধিবেশনে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

তারেক রহমান বলেন, দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা দিতে চাই বিএনপি শুধু আপনাদের ভোটের পুনরুদ্ধারই নয়, আপনার ভোটের প্রয়োগের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। আপনাদের সমর্থন পেলে বিএনপি এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে সরকার আপনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। আমি জনগণের সমর্থন চাই, সবার সহযোগিতা চাই। বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থক-শুভার্থীদের প্রতি আহবান, আপনারা শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ থাকুন।

নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষতাই হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় পুঁজি। কিন্তু সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যেই জনমনে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান দলটির এই শীর্ষ নেতা।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জনরায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে গণহত্যাকারী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহবান, সারা দেশে গণহত্যাকারীদের দোসর মাফিয়াচক্রকে পুনর্বাসনে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থেকে সরে আসুন। অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগামী দিনের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার রোডম্যাপ ঘোষণা করুন।

ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান : দ্বিতীয় অধিবেশন শেষে প্রায় ৩৫ মিনিট দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, সাড়ে ৫ মাস আগে বলেছিলাম প্রত্যাশিত নির্বাচনের আগে অদৃশ্য শক্তি ষড়যন্ত্র করবে। গত ৫ মাসে অনেক কিছু দৃশ্যমান হচ্ছে। তাই সবাইকে এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করছি। তারেক রহমান বলেন, এক এগারো ও গত ১৫ বছর আপনারা (বিএনপি নেতাকর্মী) দলকে ভাঙতে দেননি। সবাই কম বেশি অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন, তার পরেও বিএনপিকে রক্ষা করেছেন। তাহলে এখন কেন পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। যারা দলকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছে, আমরা তাদেরকে এটা করতে দেব না। এই দলকে রক্ষা করার জন্য আপনাদের দরকার। 

তিনি বলেন, আমরা এমন একটা সময় সংস্কারের প্রস্তাব করেছি যখন কেউ কথা বলেনি। মাফিয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আড়াই বছর আগে আমরাই প্রথম সংস্কার প্রস্তাব করেছি। আজকে অনেকেই সংস্কার নিয়ে কথা বলছেন। আমরা তাদের স্বাগত জানাই, তারাও আমাদের কথাগুলোই বলছেন। এখন অনেকেই এসি রুমে বসে ও রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে সংস্কার করছে। তারেক রহমান বলেন, আমাদের যে কোনোমূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমরা তিস্তা, ফারাক্কা ও বিডিআর পিলখানা নিয়ে কথা বলেছি। আপনারা কী মনে করেন ওপার থেকে ষড়যন্ত্র থেমে যাবে? দেশের সীমানার মধ্যেও তাদের সহযোগীরা আছে। তারা কি বসে থাকবে? কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রকে আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। বিদেশে আমাদের কোনো প্রভু নেই, বন্ধু আছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে আমরা কারও সঙ্গে আপস করি না। কারণ আমাদের নীতি হচ্ছে-সবার আগে বাংলাদেশ। 

তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি কিছু কিছু রাজনীতিক দলের সদস্যরা মানুষের কাছে বলছে, তারা বেহেশতের টিকিট বিক্রি করছে। এই বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করতে হবে। যাদের রাজনীতি মিথ্যা দিয়ে শুরু, তারা কি না করতে পারে। এই বিষয়টি দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যমান হোক মোকাবিলা করতে হবে। এটা নিয়ে আপনাদের (নেতাকর্মী) চিন্তা করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষ একটি স্থিতিশীলতা চায়। তারা তাদের মতো করে নিরাপদে থাকতে চায়। আর সেই পরিস্থিতি বিএনপির পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। এজন্য প্রতিটি এলাকায় নেতাকর্মীও জনগণকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমি বিশ্বাস করি যে মানুষগুলো বছরের পর বছর অত্যাচার, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আজকের এই অবস্থায় এসেছেন তাদের দরকার সংকল্প। এ সময় তিনি বিগত বিএনপি শাসনামলের ভালো কাজগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরার কথা বলেন। 

২০টিরও বেশি সিদ্ধান্ত গৃহীত : দ্বিতীয় পর্বের শেষের দিকে রাত পৌনে ১০টায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে মতামতের ভিত্তিতে ২০টিও বেশি সিদ্ধান্ত উত্থাপন করেন। পরে তৃণমূল নেতাদের সর্বসম্মতিতে তা পাশ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেসব সংস্কার প্রস্তাব নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করা সম্ভব তা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা। এজন্য জাতীয় নির্বাচনমুখী সংস্কারের জন্য সরকারের প্রতি সভা থেকে আহ্বান জানানো হয়। বলা হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। একটি অবাধু, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এতে সহযোগিতা করবে সব গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল ও দেশের মানুষ। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বলা হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষদের আস্থায় এনে সম্মিলিতভাবে সুবিধাভোগী ও সিন্ডিকেটের পাশাপাশি দেশের ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বলা হয়, বিশৃঙ্খলা পরিবেশ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয়। ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলে গুম-খুন-গায়েবি মামলাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করেছে তারা কিভাবে নির্বিঘ্নে দেশ থেকে বেরিয়ে গেলেন তার একটি ব্যাখ্যা সভা থেকে দাবি করা হয়েছে। যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে যারা ফ্যাসিবাদের দোসর সরকারের বিভিন্ন জায়গায় বসে আছে বা তাদের যারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন তাদের প্রত্যাহার করতে হবে।

বর্ধিত সভার উদ্বোধনী পর্বে সারা দেশের তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের বিভিন্ন স্তরের প্রায় চার হাজার নেতা অংশ নেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মানে মূল মঞ্চে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারটি ফাঁকা রাখা হয়। এই চেয়ারের দুই পাশে বসেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। ভার্চুয়ালি লন্ডন থেকে যুক্ত হন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন।

বর্ধিত সভার মঞ্চের সামনের চেয়ারে সুশৃঙ্খলভাবে বসেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক, সহসম্পাদক এবং সদস্যরা, সারা দেশ থেকে আমন্ত্রিত মহানগর-জেলা-থানা-উপজেলা এবং পৌরসভা শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব, দলের এগারো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলীয় প্রার্থী এবং প্রাথমিকভাবে মনোনয়নের চিঠি পাওয়া প্রার্থীরা।

১৯৯৭ সালের পর বড় পরিসরে এটাই প্রথম বিএনপির বর্ধিত সভা। মাঝে ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ‘লা ম্যারিডিয়ান’ হোটেলে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে ছোট পরিসরে বিএনপি বর্ধিত সভা করেছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকায় এ বছর বর্ধিত সভায় না থাকলেও ভার্চুয়ালি খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন। 

সভায় বিএনপির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার বিপ্লব পর্যন্ত দলের কার্যক্রমের ওপর তৈরি করা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। বেলা ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে দুই পর্বের সভা শুরু হয়। এরপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে এবং ছাত্র-জনতার জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন নেতারা। পরে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তার বক্তব্যের শুরুতেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আশু সুস্থতা কামনা করেন। দেশি-বিদেশি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, নোবেলবিজয়ী, গীতিকার, নাট্যকার, বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা মারা গেছেন, তাদের নাম উল্লেখ করে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। শোক প্রস্তাবে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, ব্রি. জে. আসম হান্নান শাহ, এমকে আনোয়ারসহ অনেক রাজনীতিবিদের নাম উল্লেখ করেন। রিজভী বলেন, যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লতিফুর রহমান, পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন উইলিয়াম হকিং, সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান, প্রখ্যাত সাংবাদিক সাদেক খান ও মাহফুজউল্লাহ, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান, নায়করাজ রাজ্জাক, শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক কামাল লোহানীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। এরপর উদ্বোধনী পর্বে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাগত বক্তব্য দেন। মধ্যাহ্নভোজের পর শুরু হয় রুদ্ধদ্বার দ্বিতীয় অধিবেশন। রাত ১১টা পর্যন্ত চলে এই সভা। এতে শতাধিক তৃণমূল নেতা বক্তব্য দেন। এতে চলমান পরিস্থিতি, দলের সাংগঠনিক অবস্থা, জাতীয় নির্বাচনে করণীয়, কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে ও প্রার্থী মনোনয়নে রাজপথের নেতাদের মূল্যায়নসহ নানা বিষয় উঠে আসে। এ অধিবেশনে তৃণমূল নেতারা সাংগঠনিক এবং বর্তমান পরিস্থিতির ওপর বক্তব্য দেন। সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

সকাল সাড়ে ৮টা থেকে আমন্ত্রিত নেতারা আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে এলডি হলের সামনের মাঠের সভাস্থলে প্রবেশ করেন। প্রবেশমুখে অভ্যর্থনা কমিটির সদস্যরা গোলাপ-রজনীগন্ধার ফুল দিয়ে নেতাদের শুভেচ্ছা জানান। 

তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য জনমনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করলেও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো কোনো উপদেষ্টার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য-মন্তব্য স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য হতাশার কারণ হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের নিঃশর্ত সমর্থন থাকলেও সরকার এখনো তাদের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারছে না।

দেশের আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক পরিস্থিতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামে কেন দেশের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চাইছে-এটি জনগণের কাছে বোধগম্য নয়। স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটি হবে সারা দেশে পলাতক স্বৈরাচারের দোসরদের পুনর্বাসনের একটি প্রক্রিয়া-যা সরাসরি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী। 

গণহত্যাকারী টাকা পাচারকারী দুর্নীতিবাজ মাফিয়াচক্রকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার এই ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, মাফিয়া প্রধান হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর এ পর্যন্ত ১৬-১৭টি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিএনপি সব নতুন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে স্বাগত জানায়। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রহণ কিংবা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে জনগণ। সুতরাং প্রতিটি দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সবার আগে নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তুত রাখতে হবে। 

হাজারো শহিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাপ্রিয় বীর জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের সামনে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই সুযোগ এবং সম্ভাবনা নস্যাৎ করার জন্য এরই মধ্যে নানারকম ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। সুকৌশলে রক্তপিচ্ছিল রাজপথে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য এবং জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে। এর বিরুদ্ধে দেশের কৃষক-শ্রমিক-জনতা, আলেম-ওলামা, পির-মাশায়েখ তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্র বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল তাদের ষড়যন্ত্র কিন্তু এখনো থেমে নেই। সংস্কার কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন এসব ইস্যু নিয়ে জনগণের সামনে এক ধরনের ধূম্যজাল সৃষ্টি করা হচ্ছে। 

তারেক রহমান বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি আজ এবং আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপির ৩১ দফা হচ্ছে, একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সনদ। তবে এই ৩১ দফাই শেষ কথা নয়, সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র সরকার-রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কারের জন্য এই ৩১ দফায়ও সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ রয়েছে। এমনকি বিএনপির ৩১ দফার সঙ্গে বর্তমান অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রস্তাবে খুব বেশি ইস্যুতে মৌলিক বিরোধ নেই বলে মনে করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যে দেশে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান তথা দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবেন। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাসকারী আমাদের সবার একটিই পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট। বিএনপি মনে করে বর্তমান বিশ্বে স্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই। বরং একটি দেশের সঙ্গে অপর দেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা, প্রয়োজন এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নীতি সবার আগে বাংলাদেশ। অর্থাৎ নিজ দেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষাই হতে হবে প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার। 

বিএনপি একটি বৃহৎ পরিবার উল্লেখ করে নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই পরিবারের নানা বিষয়ে আমাদের মতের অমিল থাকতেই পারে। সুতরাং বক্তব্য দেওয়ার সময় ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিরোধকে এড়িয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয় বলেই আমি মনে করি। আমরা সবাই আমাদের ঐক্যের শক্তির সক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত। ঐক্যই আমাদের বারবার বিজয় আর সফলতা এনে দিয়েছে। সুতরাং আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি আলোচনা-সমালোচনা যেন নিজেদের মধ্যকার ঐক্য বিনষ্টকারী কিংবা দলের ক্ষতির কারণ না হয়। নেতানেত্রীদের সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রশংসাসূচক শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা, বুদ্ধিমত্তা এবং পরিমিতিবোধের পরিচয় দেবেন বলে অনুরোধ জানান তারেক রহমান। 

গত দেড় দশকে সারা দেশে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের ভিন্ন দল এবং মতের নেতাকর্মীদের অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কেবল বিএনপিরই প্রায় ৬০ লাখের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দেড় লাখ রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী, কমিশনার চৌধুরী আলমের মতো অনেক নেতাকর্মীর আজ পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি। শুধু বিএনপি করার অপরাধে হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থককে গুম, খুন, অপহরণ করা হয়েছে। তবুও বিএনপির নেতাকর্মীরা কেউ দল ছেড়ে যাননি। স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস করেননি। আপনাদের এই সৎ সাহস এবং সততার কারণে বিএনপি আজ শুধু একটি সাধারণ রাজনৈতিক দলই নয়-দেশের গণতন্ত্রকামী স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ বিএনপিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের ভ্যানগার্ড হিসাবে বিশ্বাস করে। 

স্বাগত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের মানুষের অনেক আশা-ভরসা ছিল, ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর আমাদের দেশের অবস্থার পরিবর্তন হবে। অতিদ্রুত দেশের জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারবেন এবং গণতন্ত্রকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে গণতন্ত্রের চর্চা করা হবে। কিন্তু আমরা দুঃখের সঙ্গে দেখছি-সেই লক্ষ্যে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাচ্ছি না।’ বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক সংকীর্ণ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, ক্রমান্বয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ থাকছে না।’ গণতন্ত্রকে বিঘ্নিত করতে চক্রান্ত করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়েছি। শেখ হাসিনাকে তাড়িয়েছি। আমরা এখন অপেক্ষা করছি জনগণের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যে স্বপ্ন একটা আধুনিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ রূপান্তরিত করা। সেই গণতন্ত্রকে বিঘ্নিত করতে একটা মহল বিভিন্ন চক্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিদেশে গিয়ে সেই চেষ্টা করছেন। বাইরে থেকেও চেষ্টা করা হচ্ছে একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।


Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম