নতুন সংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ
কমিটি প্রত্যাখ্যান, বিক্ষোভ মারামারি সড়ক অবরোধ

ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ নামে আত্মপ্রকাশ করল নতুন ছাত্র সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে এ সংগঠনের নাম ও আহ্বায়ক কমিটির নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার। আর সদস্য সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন জাহিদ আহসান। নতুন ছাত্র সংগঠনের কমিটি প্রত্যাখ্যান করে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কমিটির সদস্য ও পদবঞ্চিতদের মধ্যে কয়েক দফা মারামারিও হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হন।
এদিকে, নতুন কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাতে শাহবাগে বারডেম হাসপাতালের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তারা বলেন, জুলাই বিপ্লবে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে গিয়েছিল, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই সেই আন্দোলনকে একদফায় পরিণত করে। কিন্তু নতুন সংগঠনের কমিটিতে ঢাবি শিক্ষার্থীরাই পদ ভাগাভাগি করেছে। উপেক্ষিত হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। শুক্রবারের মধ্যে বিষয়টি সমাধানে আলটিমেটামও দিয়েছেন তারা। এদিকে বুধবার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাত পৌনে ১০টার দিকে রূপায়ন টাওয়ারের সামনের সড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা জানান, হামলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ করবেন তারা। এর মধ্যে সমাধান না হলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ব্লকেডের ডাক দেবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।
পূর্ব ঘোষণা আনুযায়ী, বুধবার বেলা ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশের কথা ছিল। তবে সমন্বয়কদের অনুপস্থিতিতে সঠিক সময়ে তারা সংবাদ সম্মেলন শুরু করতে পারেননি। এরই মধ্যে বিকাল ৪টার দিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ নিজেদের পদবঞ্চিত দাবি করে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে আসেন। এ সময় তারা ‘সিন্ডিকেটের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘সিন্ডিকেটের কমিটি মানি না, মানব না’, ‘ঢাবির কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।
এর প্রায় ৪০ মিনিট পরে একটি মিছিল নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে আসেন নতুন কমিটির সদস্যরা। তবে ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মধুর ক্যান্টিনের ফটকেই তারা সংবাদ সম্মেলন শুরু করার চেষ্টা করেন। এ সময় পদবঞ্চিতরা হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে উভয়পক্ষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে কমিটি ঘোষণার জন্য মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে ঢুকে পড়েন নতুন কমিটির সদস্যরা। পদবঞ্চিতদের একাংশ ক্যান্টিনের ভেতরে ঢুকে ফের হট্টগোল শুরু করেন। এর মধ্যেই নতুন কমিটি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার।
আবু বাকের বলেন, শিক্ষা ঐক্য মুক্তি স্লোগানে আমাদের নতুন ছাত্র সংগঠন এখন থেকে পথ চলা শুরু করল। এই ছাত্র সংগঠনের নাম হচ্ছে-‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’। কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে থাকছেন-আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম, সদস্য সচিব জাহিদ আহসান, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব রিফাত রশীদ, মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী এবং মুখপাত্র আশরেফা খাতুন।
আবু বাকের ঘোষণা করেন সংগঠনের ঢাবি কমিটির নামও। তিনি বলেন, ঢাবি কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুল কাদের, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক লিমন মাহমুদ হাসান, সদস্য সচিব মহির আলম, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আল আমিন সরকার, মুখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম এবং মুখপাত্র রাফিয়া রেহনুমা হৃদি।
সূত্রমতে, আবু বাকের মজুমদার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি ঢাবির ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এখানে ভর্তি হন। গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর কার্যক্রম স্থগিত হওয়া ছাত্রসংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র ঢাবি শাখার সদস্য সচিব ছিলেন আবু বাকের মজুমদার। এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পাওয়া জাহিদ আহসানও সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলের সম্পাদক। তিনি ঢাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। জাহিদ এক সময় ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাবি শাখার দপ্তর সম্পাদক ছিলেন।
নতুন ছাত্র সংগঠনের মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদাসসির চৌধুরী আর মুখপাত্র আশরেফা খাতুন দুজনই ঢাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সংগঠনটির ঢাবি শাখার আহ্বায়ক সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে আলোচনায় এসেছিলেন। কাদেরের সঙ্গে সদস্য সচিব হিসাবে আছেন মহির আলম। দুজনই ঢাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। কাদের আগে ছাত্রশক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আর মহির ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কোনো পদে ছিলেন না। ঢাবি শাখার মুখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম আর মুখপাত্র রাফিয়া রেহনুমা হৃদি দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই দুই সমন্বয়ক গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তিরও নেতা ছিলেন।
কমিটি ঘোষণার পরপরই তারা মধুর ক্যান্টিন থেকে একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি আইবিএ, শ্যাডো ও মল চত্বর এলাকায় কয়েক দফায় ধস্তাধস্তিতে জড়ান পদবঞ্চিতদের সঙ্গে। এতে অন্তত ৩ জন আহত হন। এর মধ্যে মিশু আলী ও আকিব আল হাসান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
মারামারির বিষয়ে জানতে চাইলে এআইইউবির শিক্ষার্থী জুবায়ের বলেন, এই কমিটিতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেই বললেই চলে। ১৭ জুলাইয়ের পরের আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কি কম ছিল? এই কমিটি করার সময় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। এই কমিটি আমরা মানি না।
মারামারির বিষয়ে জানার জন্য নতুন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তারা তা রিসিভ করেননি।
তরিকুল ইসলাম নাহিদ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ১৭ জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার ভয়ে লেজ গুটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তখন যারা তাদের তুলে এনেছিল এবং আন্দোলনকে একদফায় পরিণত করেছিল, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু আমরা দেখছি কমিটির সুপার সিক্সের ৬ জনের মধ্যে ৫ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, বাকি একজন সম্ভবত জাহাঙ্গীরনগরের। এই কমিটিতে প্রাইভেট নেই, জগন্নাথ নেই, কোনো মাদ্রাসাও নেই। তিনি আরও বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা না চাইবে এবং কমিটি পুনর্গঠন না করবে, তাদের কোনো কর্মসূচিতে আমরা আর অংশগ্রহণ করবো না।
বাংলামোটরে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ : বাংলামোটরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করলে ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা বলেন, ছাত্রলীগ স্টাইলে তাদের মারা হয়েছে। বুকে-পিঠে লাথি দেয়া হয়েছে। ২৪-এর বাংলাদেশে এটা কখনোই কাম্য নয়।
সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক মঞ্জু বলেন, সবকিছু একটি সিন্ডিকেটের কাছে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে। সব সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে।