দায়িত্ব নিচ্ছেন তরুণদের নতুন দলের
নাহিদ ইসলামের পদত্যাগ
গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মাঠে থেকে কাজ করব-পদত্যাগের পর উপদেষ্টা * দল ঘোষণা শুক্রবার; পাঁচ লক্ষাধিক কর্মী-সমর্থকের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
-67be30d52ca7c.jpg)
ছবি: সংগৃহীত
আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় থাকা তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে সরকার থেকে পদত্যাগ করেছেন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগের পর তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মাঠে থেকে কাজ করার লক্ষ্যে পদত্যাগ করেছি। সরকারের চেয়ে বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে।’
তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার)। এদিন রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দলের আত্মপ্রকাশ হবে। এতে পাঁচ লক্ষাধিক কর্মী-সমর্থকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। ওইদিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই দলের দায়িত্ব নেবেন সদ্য বিদায়ি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনীতিতে আলোচনায় আছে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি। নতুন এ দলের দায়িত্ব নিতে সরকারের উপদেষ্টা পদ ছাড়বেন নাহিদ ইসলাম-এমন গুঞ্জন কয়েক সপ্তাহ ধরে। তবে সব আলোচনার ইতি টেনে মঙ্গলবার উপদেষ্টা থেকে পদত্যাগ করলেন নাহিদ।
পদত্যাগের পর প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় এক সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মাঠে থেকে কাজ করার লক্ষ্যে পদত্যাগ করেছি। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করেছি, সরকারের চেয়ে বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে। ছয় মাস খুবই কম সময়। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি। দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। এর বাইরেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছি। কাজের মূল্যায়ন জনগণ করবে।
নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, নতুন যে রাজনৈতিক দল গঠিত হচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণ করার তার অভিপ্রায় আছে। আমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি, সব কমিটি থেকে ইস্তফা দিয়েছি। গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি হিসাবে তিনজন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যৌক্তিক। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গত সাড়ে ছয় মাস সরকারে কাজ করেছি। হয়তো আমরা আশানুরূপ ফলাফল এখনো পাইনি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে সরকারে একটা স্থিতিশীলতা এসেছে।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকারের বাইরে দেশের যে পরিস্থিতি, সেই পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক শক্তি উত্থানের জন্য আমার রাজপথে থাকা প্রয়োজন। আমরা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা করি, সে আকাঙ্ক্ষার জন্য এবং গণ-অভ্যুত্থানে যেসব ছাত্র-জনতা অংশ নিয়েছে, সেই শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করছি, সরকারের থেকে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে। বাইরে আমাদের যে সহযোদ্ধা রয়েছেন, তারাও এটি চান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মূলত পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।
সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে থাকা অন্য দুজন ছাত্র প্রতিনিধির ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওনারা দল করার প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই সরকার ছেড়ে আসবেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমলতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুলিশের আস্থাহীনতার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সমস্যা আছে। তবে আশা করছি, সরকার জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হবে। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগষ্ট দেশ থেকে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগষ্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই অন্তর্বর্তী সরকারে তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন নাহিদ ইসলাম।
পদত্যাগপত্রে যা আছে : প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে নাহিদ উল্লেখ করেন, ‘নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আপনার নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনে সদাসচেষ্ট থেকেছি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমার ছাত্র-জনতার কাতারে উপস্থিত থাকা উচিত মর্মে আমি মনে করি। ফলে আমি আমার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়া সমীচীন মনে করছি। এ অবস্থায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার পদ থেকে অব্যাহতি চাচ্ছি।’
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, তরুণদের নতুন দলের মূল নেতৃত্বে থাকছেন নাহিদ ইসলাম। উপদেষ্টা পদে যাওয়ার আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তাকে দুবার আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই সময় বেশ নির্যাতনের শিকার হন। আর দলটির সদস্য সচিব হিসাবে দায়িত্ব পেতে পারেন আখতার হোসেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব। জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখা আখতার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন।
এছাড়া দলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তালিকায় আছেন-বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আলী আহসান জোনায়েদ, সামান্তা শারমিন, সারোয়ার তুষার, আব্দুল হান্নান মাসউদ, আরিফুল ইসলাম আদীব, আরিফ সোহেল, ডা. তাসনিম জারা, ডা. তাজনভা জাবীন, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া, তারেকুল ইসলাম, আকরাম হোসাইন সিএফ, অনিক রায়, আতিক মুজাহিদ, অলিক মৃ, আব্দুল্লাহ আল আমিন, আলী নাছের খান, নাহিদা সারওয়ার চৌধুরী, আসাদ বিন রনি, ড. আতিক মুজাহিদ, নিজাম উদ্দীন, আতাউল্লাহ, মাহবুব আলম, সালেহ উদ্দীন সিফাত, ডা. মাহমুদা মিতু, খালেদ সাইফুল্লাহ, মনিরা শারমিন এবং নুসরাত তাবাসসুম। তারা সবাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন দলের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। পাঁচ লক্ষাধিক কর্মী-সমর্থকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ও উপকমিটির সদস্যরা।