ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করেছিল গণমাধ্যমের দালালরা: প্রেস সচিব

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে সুবিধার আশায় কতিপয় সাংবাদিক দালালি করেছিল। ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করতে ওই দালালরা বিভিন্ন বয়ান তৈরি করেছিল। তাদের সব অপকর্মের দলিল তৈরি করে সংরক্ষণ করা হবে।’ রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ফ্যাসিবাদ মুক্ত গণমাধ্যম চাইয়ের ব্যানারে ‘গণমাধ্যমের ফ্যাসিবাদী বয়ান : ফিরে দেখা ১-৩৬ জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেস সচিব বলেন, শুধু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ই নয়, বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচারী সরকারের আমলে সাংবাদিকদের একটি দল নিজেদের সুবিধার আশায় দালালি করেছে। সাংবাদিকরা কী ভূমিকা পালন করেন, তার সব প্রমাণ থেকে যায়। প্রতিটি দালালি ডকুমেন্টেড (নথিভুক্ত) হয়ে গেছে। ১-৩৬ জুলাই ছাড়াও ২০০৯ সাল থেকে বড় বড় ঘটনার বয়ান তৈরি করেছে এই দালালেরা। বড় কোনো ঘটনার সময়েও ফেসবুকে সাংবাদিকদের একটা গ্রুপ বয়ান তৈরি করত। তারা ঘটনাগুলোকে বৈধতা দিত। এগুলো করার মাধ্যমে স্বৈরাচারকে স্থায়ী ও মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছে। মানুষ মারার বৈধতা দেওয়া হতো।
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে গণমাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, মেধা কতটুকু, কী সাংবাদিকতা করে, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। ব্যক্তিজীবন, রাজনৈতিক মতাদর্শ কী, সেটা ছিল বিবেচ্য। এসব দেখার জন্য একটি গোষ্ঠী ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে শুধু পত্রিকাতেই দালালি হয়নি, বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিও ও টকশোতেও হয়েছে। এগুলো করার মূল কারণ ছিল পূর্বাচলে একটা প্লট বা অ্যাকাউন্টে অনেক টাকা।
শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার খুবই একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় যাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়তে চাই। সেটার জন্য গতকাল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে। আমরা চাচ্ছি পুরো বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটি এখানে কন্ট্রিবিউট (অবদান) করুক। তিনি বলেন, আমরা এমন একটা বাংলাদেশ চাই যেখানে ফ্যাসিবাদের বয়ান কেউ তৈরি করবে না। যে অন্ধ হয়ে তার পার্টিকে ফলো করবে না; লিডার কিলিং করছে অথচ আপনি তাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন। এ ধরনের পলিটিক্যাল সেটআপ যেন বাংলাদেশে না থাকে। আমরা সবাই মিলে এমন একটা দেশ গড়ি যেই দেশে সবার ভয়েস শোনা যায়।
প্রেস সচিব বলেন, আমাকে বড় গলায় যে ক্রিটিসিজম করবে তাকেও আমরা ধারণ করতে চাই। আমরা রিকনসিলিয়েশনের (পুনর্মিলন) পথ সবার জন্য উন্মুক্ত করতে চাই। সবাই মিলে আমরা একটা ভালো বাংলাদেশ গড়তে চাই। এমন একটা বাংলাদেশ, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। যেখানে আপনি যে কোনো মানুষকে ক্রিটিসাইজ করতে পারবেন, অবশ্যই সেটা এভিডেন্সসহ।
তিনি বলেন, কেউ কোনো একটা বয়ান তৈরি করবেন আর আপনার সম্পর্কে লেখা হবে না এটা ভাববেন না। প্রত্যেকটা জিনিস ওয়েল ডকুমেন্টেড থাকবে। আমাদের আগের জেনারেশনে আমরা এটা ফেল করেছি। আমরা ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে লিখতে ফেল করেছি। রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার নিয়ে লিখতে আমরা ফেল করেছি। এর আগে আমাদের প্রচুর সমস্যা ছিলো, এগুলো নিয়ে লিখতে আমরা ফেল করেছি। আমরা এবার যেন ফেল না করি। আমরা যাতে ফেল না করি এর মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পরবর্তী জেনারেশন যাতে আমরা যেটা ফেস করেছি তারা যাতে সেটা ফেস না করে। বাংলাদেশে যাতে এরকম স্বৈরতন্ত্রকে লিজিটিমাইজ (বৈধতা দেওয়া) করার যে বয়ান সেটা যেন জীবনে তৈরি না হয়। যে-ই ক্ষমতায় আসুক তার হয়ে যাতে কোনো সাংবাদিক দালালি করতে না পারে। জুলাই আন্দোলনের সময় রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কিছু গণমাধ্যম দায়িত্ব পালন করেছে উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, জুলাই আন্দোলনে ৫ জন সাংবাদিক শহিদ হয়েছেন। আমাদের অনেক সাংবাদিক আহত হয়েছেন, অনেকে এখনো ট্রমাটাইজ (মানসিক আঘাত) হয়ে আছেন। বাংলাদেশের অনেক নিউজ পেপার, সাংবাদিকের রোল ১ থেকে ৩৬ জুলাই খুব ভালো ছিল। অসহনীয় একটা পরিবেশে থেকে ১৫ বছরের হাসিনা শাহীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তারা সাংবাদিকতা করেছেন। একদিকে ডিজিএফআইয়ের ফোনকল, আরেকদিকে রাজনীতিকদের ফোনকল, আরেকদিকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও সাংবাদিক লীগের চোখ রাঙানি সবকিছুকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের বেশকিছু সংবাদপত্র ভালো সাংবাদিকতা করেছে। আমরা তাদের স্যালুট জানাই।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন ফ্যাসিবাদ মুক্ত গণমাধ্যম চাইর আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন শিশির। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফ্যাসিবাদ মুক্ত গণমাধ্যম চাইর মুখপাত্র ও সদস্য সচিব প্লাবন তারিক। আয়োজক সংগঠনের সদস্য শাহেদুল ইসলামের সঞ্চালনায় আরও বক্তৃতা করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক আব্বাস উদ্দিন নয়ন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. আবু সাদিক কায়েম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহি, নিরাপদ বাংলাদেশ চাইর মুখপাত্র রায়হান উদ্দিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহতাম লিমন, জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেল সদস্য মো. মাহবুব আলম প্রমুখ।