
প্রিন্ট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:১৪ এএম

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
-67745584c0915.jpg)
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন
রাজনৈতিক দলগুলোকে মাইনাস করে ছাত্রনেতাদের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নেতাদের মতে, একটি দলের ইন্ধনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে ঘোষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে দেশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। নির্বাচনকে বিলম্বিত করে তারা চলমান শাসন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বলেও মনে করেছেন নেতারা। সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপি নেতারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন বলে জানা গেছে।
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অরাজকতা তৈরি করবে।
জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাত্র নেতাদের ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং এরপর তার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের সাক্ষাতের বিস্তারিত তুলে ধরেন। বৈঠক সূত্র জানায়, রোববার রাতে ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মির্জা ফখরুল। সাক্ষাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে ছাত্ররা এককভাবে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দিলে দেশে যে বিশৃঙ্খলা-সংকট তৈরি হবে, সেই শঙ্কার কথা প্রধান উপদেষ্টাকে জানান মির্জা ফখরুল। একই দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র প্ল্যাটফর্মের নেতারাও ‘ঘোষণাপত্র নিয়ে’ বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে একটিই এজেন্ডা ছিল তা হলো-ছাত্রদের ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের নতুন উদ্যোগ। ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় বিএনপি নেতারা এ প্রসঙ্গ নিয়ে নানামুখী অভিমত ব্যক্ত করেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে নেতারা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র প্ল্যাটফর্মের এই নতুন উদ্যোগের সঙ্গে জনগণ, রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কেউ যুক্ত নন। ছাত্ররা তাদের নিজেদের মতো করে বাংলাদেশের একটি চরিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তারা যে সংবিধান বাতিল করে দেওয়ার কথা বলছে, সেই সংবিধানের আলোকেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের একটা কাঠামোগত অবস্থান আছে। বাহাত্তরের সেই সংবিধান বাতিল করে দেওয়া হলে দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং সেই পরিস্থিতি জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং জনগণের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের কারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে-স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কয়েকজন নেতা সেই প্রশ্নও তোলেন। নেতাদের কেউ ছাত্র আন্দোলনের এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান কোনো পৃষ্ঠপোষক খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে একটি ইসলামি দলের ইন্ধন আছে বলে মনে করেন নেতারা।
বৈঠকে দু-একজন অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাদের কাছে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, বিএনপিকে টার্গেট করেই পুরো নকশা তৈরি করা হয়েছে। বৈঠকে বিএনপির এক নেতা বলেন, ছাত্রদের কর্মসূচি ঘিরে সারা দেশ থেকে যেভাবে গাড়ি বোঝাই করে লোকজন আনা হচ্ছে, তাদের অর্থের উৎস কী? তাদের অনেকে এখনো ছাত্র, অন্যরা ক’দিন আগেও ছাত্র ছিল। সে কারণে তাদের কার্যক্রম জনমানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অন্য এক নেতা বলেন, ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের কেউ ছাত্রলীগ, কেউ ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিএনপির কারও কারও অভিমত, গণআন্দোলন-বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দিতে হয় আন্দোলনের আগেই। জুলাই-আগস্টের যে গণআন্দোলন, ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতনের আগেই সেটার ঘোষণাপত্র তুলে ধরলে জনগণ তাদের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেত। কারণ, আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল কোটাবিরোধী ইস্যুতে। মানুষ তাদের সেই ঘোষণাপত্র গ্রহণ করবে কি করবে না, সে ব্যাপারে তারা তখন সিদ্ধান্ত নিত। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের প্রায় পাঁচ মাস পরে ছাত্ররা যে বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসছে, সেটা সংকট ছাড়া অন্যকিছু তৈরি করবে না। যে বিষয়গুলো বলা হচ্ছে-সেটা বাস্তবসম্মত না।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির। তবে এর আগে সোমবার রাতে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরি করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ওই রাতেই সরকারের এই উদ্যোগকে ‘সময়োপযোগী’ আখ্যা দিয়ে এটাকে সাধুবাদ জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একইসঙ্গে মঙ্গলবার বিকালে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি ঘোষণা করে, যেটা পালিত হয়। বিএনপি নেতারা মনে করেন, সরকার তাদের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন।