
প্রিন্ট: ০১ মার্চ ২০২৫, ১২:৩১ এএম

ফাইল ছবি
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ফের বিতর্কিত সিন্ডিকেটের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। চলছে বাজার দখলের মহড়া। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি সিন্ডিকেটের তাণ্ডবে বন্ধ হয়েছে এই বাজার। বর্তমানেও ঘুরেফিরে সেই চক্রের সদস্যরাই আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে এ চক্রের মূল গডফাদারসহ অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি এরকম দুই ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে সেই পুরোনো সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করেছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) বেশ কজন প্রভাবশালী নেতা এবং একাধিক ব্যবসায়ীও ছিলেন। এদিকে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর খুব শিগ্গিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরপর থেকেই তৎপর হয়ে উঠেছে অসাধু চক্রটি।
অভিযোগ আছে, বিগত সরকারের আমলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ সিন্ডিকেটের কারণে। এদের মাধ্যমে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭ লাখ ৪৩ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। এসব কর্মী পাঠাতে সিন্ডিকেটকে জনপ্রতি ১ লাখ ৭ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হয়েছে। সে হিসাবে ৭ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে। এ টাকার বেশির ভাগ পাচার করা হয়েছে। চক্রের বাংলাদেশি পার্টনারের জন্য মালয়েশিয়ার টাকা পাঠাতে হয়েছে। এভাবেও টাকা পাচার হয়েছে। চাঁদার বাকি অংশ পেয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ-সদস্য ও প্রভাবশালীরা। জানা যায়, এ চক্রের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত অভিবাসনের কারণে চলতি বছর ৩১ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ায় ৫০ হাজার কর্মী যেতে পারেননি। যার মধ্যে ১৭ হাজার কর্মী ছিলেন চূড়ান্তভাবে বিএমইটি সম্পন্ন করা। এতে কর্মী এবং এ খাতের উদ্যোক্তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অভিযোগ আছে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্যে ১০ সিন্ডিকেটের মধ্যে অন্যতম সুবিধাভোগী ছিলেন ফখরুল ইসলাম। সাবেক মন্ত্রী, সংসদ-সদস্য ও নেতাদের নিয়ে তিনি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তার সঙ্গে ছিলেন সাবেক এক সেনা কর্মকর্তা, নিজাম হাজারী, বেনজীর আহমেদ, মহিউদ্দিন মহি, কালা ফিরোজ, আবুল বাসার, মনসুর আহমেদ কালামসহ আরও অনেকেই।
গত সরকারের আমলে খোদ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো সারসংক্ষেপ থেকে এ সিন্ডিকেটের তথ্য জানা গেছে। ওই সারসংক্ষেপে বলা হয়েছিল, ‘মালয়েশিয়ার সরকার কর্তৃক নির্বাচিত বাংলাদেশি ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।’ চার পাতার ওই গোপন প্রতিবেদনে ঢাকার প্রভাবশালী ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সমন্বয়ে কীভাবে জি-টু-জি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ‘সিন্ডিকেট’ গঠন এবং ১০ এজেন্সির প্রত্যেকের সঙ্গে আরও ২০টি করে এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্ত করে (২০০ রিক্রুটিং এজেন্সি) মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো হবে, সেই ব্যাপারে একটি মনিটরিং সেল গঠনের কথাও ওই সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়।
সিন্ডিকেট করে পৌনে পাঁচ লাখ শ্রমিক যাওয়ার পর শ্রমবাজার বন্ধের আগ পর্যন্ত যে ১০১ জনের নাম উল্লেখ করে সিন্ডিকেট গঠন হয়েছিল, এর নেপথ্যে ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর পরিবারের এক সদস্য। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া সরকারের তৎকালীন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর হাত ধরে আরেকটি সিন্ডিকেট গঠন করেন দেশের এক ব্যবসায়ী। ওই সিন্ডিকেট গঠনের পর সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১০১ জনে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের নামও ছিল।
প্রথম ১০ জনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পৌনে তিন লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। আর দ্বিতীয় দফায় সিন্ডিকেট হওয়ার পর দুই গ্রুপের পাঠানো কর্মীর সংখ্যা হয় পৌনে পাঁচ লাখ। এরপর দুই সিন্ডিকেট একে অপরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুস লেনদেনের অভিযোগ শুরু করে। একপর্যায়ে অনেকটা তোপের মুখে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশসহ সোর্স কান্ট্রিভুক্ত দেশগুলো থেকে শ্রমিক নেওয়াই বন্ধ করে দেয়।
অপরদিকে ১০১ জন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট গঠন করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বায়রার এক সদস্য সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদ, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ-সদস্য নিজাম হাজারী, বেনজীর আহমেদসহ ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে পল্টন থানায় মানব পাচার আইনে একটি নিয়মিত এজাহার দায়ের করেন। এ মামলা দায়েরের পর নানা দিক থেকে হুমকি ও চাপের একপর্যায়ে বাদী দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।
২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে জি-টু-জি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মী প্রেরণের জন্য বাংলাদেশি ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির নাম মনোনয়ন করা হয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় যোগ্যতাসম্পন্ন ৭৪৫টি এবং ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর আরও ৩৪১টিসহ ১ হাজার ৮৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চূড়ান্ত করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। সারসংক্ষেপে বলা হয়, অনলাইন পদ্ধতিতে কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ১০ সদস্যের সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার কর্মী পাঠানোর পর বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আবারও কূটনৈতিকভাবে চেষ্টার পর শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয়বার শ্রমবাজার খোলার পর সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পৌনে ৫ লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। এর মধ্যে বৈধভাবে সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পরও অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিককে মালয়েশিয়া সরকার ঢোকার অনুমতি দেয়নি।
অভিযোগ আছে, মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাণিজ্যে শুধু ফখরুল হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। নিজের মেডিকেল সেন্টার ওয়েলকাম মেডিকেলের মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর নামমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে তিনি হাতিয়ে নেন এ টাকা। তার বিরুদ্ধে এখন গোপনে নতুন দুইটি লাইসেন্স দিয়ে ফের নতুন করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। কিছুদিন আগে ১৭ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে না পারার সঙ্গে অভিযুক্ত যে ১০১ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সে তালিকায়ও রয়েছে তার এজেন্সি ও ওয়েলকাম মেডিকেল সেন্টারের নাম।
এ খাতের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনুমোদিত এজেন্সিগুলো ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে একজন কর্মীর জব অ্যালোকেশন, ডিমান্ড লেটার, সত্যায়ন, ভিসা করানো, বিটিএমইএ-এর ক্লিয়ারেন্স, নিয়োগানুমতি ও বহির্গমনসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক কাজ সম্পাদন করছে। অপরদিকে সিন্ডিকেটের সহযোগী এজেন্সিগুলো ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় টিকিট কেটে সেই টিকিট বিক্রি করছে ৪ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা।
খোদ বায়রা সদস্যদের অভিযোগ, ১০১ সিন্ডিকেটভুক্ত এজেন্সির মধ্যে ত্রিবেণি ইন্টারন্যাশনাল ও সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনালের নেপথ্য মালিকানা রয়েছে ফখরুল ইসলামের। তিনি নিজের লাইসেন্স সরাসরি ব্যবহার না করে অন্যের নামে ব্যবসা করছেন। তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে এ খাতের অন্য ব্যবসায়ীদের নিজ নামে লাইসেন্স একটা থাকলেও তার লাইসেন্স ২টি।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বায়রার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রিয়াজ উল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘বিগত সরকারের আমলে প্রত্যেক সেক্টরে বিভিন্নভাবে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল। ‘সাবেক সরকারের মন্ত্রী, সংসদ-সদস্য ও নেতাদের নিয়ে এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন নিজাম হাজারী, বেনজীর আহমেদ, মহিউদ্দিন মহিসহ আরও অনেকেই। তার অভিযোগ, ‘সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া যাওয়া কর্মীদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়েছে, যেখানে সিন্ডিকেটের চাঁদা ছিল জনপ্রতি ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এই অতিরিক্ত চাঁদার কারণে বড় বড় কোম্পানি যারা বিনা পয়সায় কর্মী নেয়, তারা বাংলাদেশ থেকেও কর্মী না নিয়ে নেপাল থেকে নিয়েছে। অনেকে কর্মী নিতেই পারেনি। এ সিন্ডিকেটের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ায় ৫০ হাজার কর্মী যেতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে ফখরুল ইসলাম স্বপন যুগান্তরকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আমি কখনোই সিন্ডিকেট করিনি। উলটো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জোরালো কথা বলেছি। মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গঠন করা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ খোলার কারণে তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার যে ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে, সেটি অনেক আগের। সরকারি একটি প্রোগ্রামে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, আগের আমলে কর্মীপ্রতি ১ লাখ ৭ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। প্রতিটি মেডিকেল পরীক্ষার জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। ওই সিন্ডিকেটগুলোকে ৭ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, পল্টন থানার মামলায় আমার নাম নেই। আর ওয়েলকাম ডায়াগনস্টিকের মাধ্যমে কোনো অনিয়ম হয়নি। আমি অন্যের কোনো লাইসেন্সও ব্যবহার করিনি।