
প্রিন্ট: ২৮ মার্চ ২০২৫, ০৬:৪৯ পিএম
বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সহায়ক
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৫, ১০:৪৮ পিএম

আরও পড়ুন
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের পর এই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তার নিজস্ব গতিতে চলছে। নিজেদের অধিকার ও জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা ছাড়া পররাষ্ট্রনীতিতে আন্তর্জাতিকভাবে তার কোন কঠোর বক্তব্য নেই।
এই মুহূর্তে সকল দেশ বাংলাদেশকে বন্ধু ভাবছে। শুধুমাত্র ভারত অজানা শঙ্কায় চিন্তিত। অথচ আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কোনভাবেই যে তাদের জন্য ক্ষতিকর নয় তা তারা সবাই বুঝতে পারছে না। জনগণের বিশাল একটা অংশ বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে। তারা বিশ্বাস করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, অগ্রগতি ও উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রাজনৈতিক কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তি এ কথাটি বোঝার চেষ্টা করছে না।
বাংলাদেশের মানুষকে উগ্র ও অসহিষ্ণু হিসেবে উপস্থাপন করে তারা নিজেদের অপরিহার্যতা প্রকাশ করতে চায়। অথচ এর বিন্দুমাত্র কারণ বাংলাদেশে উপস্থিত নেই। দেশের সকল নাগরিক এখন বেশ কিছু প্রশ্নে একই মনোভাব পোষণ করে। এটা ভারতের জনগণের বিশাল একটা অংশ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এবং তারা আমাদের সঙ্গে চমৎকার ভবিষ্যৎ আশা করে। বিশেষত দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম এই বিষয়ে একমত।
বাংলাদেশ যেহেতু আঞ্চলিক কোন সামরিক জোট বা পরাশক্তির সঙ্গে নেই তাই যেকোনো দেশের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক অন্য কারো জন্য ক্ষতিকর নয়। সুতরাং দেশগুলো বাংলাদেশকে তার জন্য শতভাগ নিরাপদ মনে করতে পারে।
এর আগে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দুর্দান্ত গতি পেয়েছিল। পৃথিবীর কোনো পরাশক্তির সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা না রেখে আঞ্চলিক দেশগুলোর মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে সার্ক গঠন ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে বিশ্ব দরবারে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিলেন। সেটা ছিল আরেকটা সোনালী অধ্যায়। বাংলাদেশকে তার মতো চলতে দিলে আঞ্চলিক কোন দেশের জন্যই যে তা ক্ষতিকর নয় সেটা জিয়ার শাসনামল বিবেচনা করলেই স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ তার নিজস্ব সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। তবে কারো স্বার্থে আঘাত দিয়ে নয়।
আমার মনে হয় ভারত যদি সত্যিই তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে এবং সেটা দূর করার জন্য আন্তরিক হয় তাহলে অতীতের ভুল করবে না। ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমরা ভাষার পরিচয়ে একীভূত। বেশ কিছু নদী আমাদের মধ্যে অভিন্ন সংস্কৃতির স্থাপন করে দিয়েছে। পুরো বঙ্গ অঞ্চলের মানুষ অন্যের ধর্মের প্রতি সহনশীল। এটাই এই অঞ্চলের বিশেষত্ব। উপমহাদেশে এমন আরেকটি জাতি নেই।
এমন সম্ভাবনাময় পররাষ্ট্রনীতি ধরে রাখতে বাংলাদেশের সকল দলের একটি সিদ্ধান্তে একমত থাকতে হবে। এমন একজন ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে যিনি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য।
ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাবেক কর্মস্থলে একটি রিপোর্ট করেছিলাম। সেখানে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক জন ড্যানিলয়েচ ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অনলাইন এক্টিভিস্ট ও সেন্ট্রিস্ট নেশন টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা শাফকাত রাব্বি অনিকের সাক্ষাৎকারের সুযোগ হয়েছিলো। সেখানে সাক্ষাৎকারের একাংশে শাফকাত রাব্বী অনিক বলেছিলেন, আমাদের পররাষ্ট্র বিভাগে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো মুখ না থাকা বাংলাদেশের জন্য বড় ব্যর্থতা। ব্যক্তিগতভাবে আমিও তাই মনে করি।
সুতরাং আগামী দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করতেই হবে। এবং সেই ব্যক্তি যেনো এই অঞ্চলে মানুষের কাছে অধিকারের লড়াইয়ে পূর্ব থেকেই পরিচিত থাকেন। তাতে ভবিষ্যতে ভারত একই পথে হাঁটলে আমরা ভারতীয় জনগণকে পাশে পাবো। দুষ্টু রাজনীতিকদের কথায় জনগণ বাংলাদেশ থেকে আস্থা হারাবে না। যেই আস্থা এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে এখন যে স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতিতে চলছে সেটা প্রকৃতপক্ষেই কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এই কথার প্রমাণ দেয়। আমরা সকল দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়েছি। যারাই আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য একসঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছে তাদের সঙ্গে নিজস্ব স্বার্থ শতভাগ বজায় রেখে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
পাকিস্তান থেকে আমরা খাদ্যপণ্য আমদানি করছি। নানা কাজে চীন আমাদের অর্থনৈতিক বন্ধু হিসেবে জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বাংলাদেশের জনগণ তাদের বন্ধু মনে করছে। অন্যদিকে ভারতকে বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু হিসেবে পেতে চায় এদেশের জনগণ। কিন্তু প্রভুত্ব মেনে নিতে তারা অক্ষম বলে জানিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে সেই বার্তা ভারতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
আমার বিশ্বাস এই স্বতন্ত্র ধারা বজায় রেখে বাংলাদেশ অদম্য গতিতে দেশের মানুষের উন্নতি সাধনে ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে দক্ষিণ এশিয়াকে শান্তির পথ দেখাবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর লোকাল গভর্নমেন্ট ডিসকোর্স