
প্রিন্ট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:০৩ এএম
এ ধৃষ্টতার পরিসীমা নেই
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:৫৫ পিএম

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন
এগুলো তো নিছক কোনো গ্রাফিতি নয়। নয় মনের খেয়ালে আঁকা দেয়ালচিত্র। কিংবা নয় শুধুই শিল্পকর্ম বা ব্যঙ্গচিত্র। ওগুলো আমাদের সন্তানদের, ছাত্র-তরুণদের বুকের টকটকে তাজা রক্তে আঁকা। সন্তানহারা সহস্র মায়ের-বোনের অশ্রুতে আঁকা। তারুণ্যের ক্রোধ আর ঘৃণার মিশেলে আঁকা। এগুলো তো দ্রোহ আর লড়াইয়ের হাতিয়ার। ইতিহাসের জীবন্ত চিত্র। দানবের বিরুদ্ধে মানবের ভাষা বাঙময় হয়েছে ওই সব গ্রাফিতিতে।
হাসিনার ঘাতক ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে জানবাজ লড়াইয়ের প্রেরণা ছিল ওই সব গ্রাফিতি। যেসব অহিংস ও সৃজনধর্মী হাতিয়ার হাসিনার নৃশংস রেজিমকে ঘায়েল ও ধরাশায়ী করেছে এই সব গ্রাফিতি তো সেই সব অস্ত্রাগারের অংশ। দুঃশাসন বধের এই অস্ত্রকে কি পরাজিত করা যায়? ইতিহাস মুছতে গেলে তা আরও বেশি নির্মম ও নিষ্ঠুর প্রত্যাঘাত হয়ে ফিরে আসে।
জুলাই বিপ্লবের সময়কালে ছাত্র-তরুণদের আঁকা ওই গ্রাফিতিগুলোতে ফ্যাসিস্ট রেজিম তাদের অপরাজনীতির ভিত্তির বিরুদ্ধে সুতীব্র ঘৃণা ও ক্রোধ প্রকাশিত হয়েছে। এই ক্রোধকে, রোষকে, ঘৃণাকে সহ্য করা, হজম করা ফ্যাসিস্ট রেজিম এবং এর কোনো দোসরের পক্ষে সম্ভব নয়। এই অহিংস শৈল্পিক অস্ত্রগুলোকে ওদের ভারি ভয়। তাই রাতের আঁধারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মেট্রো রেলস্টেশনে মুজিব-হাসিনার গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়। আমি মনে করি এটা টেস্ট কেস ছিল।
অন্যায় ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত ঐতিহাসিক সেনাছাউনি বলা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। সেই স্থানকে গ্রাফিতি মোছার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে। এ ব্যাপারে আমার বুদ্ধি-বিবেচনা আমাকে নিশ্চিত করে। যদি এই মুছে দেওয়ার বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না হতো তাহলে এই বিলোপের ক্রিয়া প্রসারিত হতো ক্রমে সারা দেশে। হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে তারুণ্যের ক্রোধ, ক্ষোভ, ঘৃণার চিহ্ন মুছে যেতো।
ছাত্রগণঅভ্যুত্থানের স্মারক চিহ্নগুলো এভাবেই মুছে দিতে পারলে তাদের পক্ষে সম্ভব হতো অচিরেই ইতিহাসকে বিকৃত করা। কে-না জানে ইতিহাসের বিকৃত বয়ান ফ্যাসিস্ট রাজনীতির এক অমোঘ অস্ত্র।
কিন্তু না। দিনভর এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে। হারানো স্বর্গ ফিরে পেতে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের লাগাতার অন্তর্ঘাত ও নাশকতার চূড়ান্ত ধাপে সচিবালয়ে সুপরিকল্পিত আগুন-সন্ত্রাসসের পরপর এই গ্রাফিতি মোছার ঘটনাকে কেউ স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনি। তাই প্রতিবাদের ঝাপ্টায় মুখোশ খুলে নেপথ্যের কারো কারো চেহারা বেরিয়ে পড়ে।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সন্মতি নিয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ গ্রাফিতি মোছার কাজ করছিল। প্রক্টরের ভাষ্য, এক গোয়েন্দা সংস্থার কেউ একজনের পরামর্শে তিনি সরল বিশ্বাসে গ্রাফিতি মোছার অনুমতি দিয়েছিলেন। বিষয়টা অতো সরল নয়, হতেই পারে না। গভীর রাতে সবার অলক্ষ্যে চুপিসারে সরল বিশ্বাসের কোনো কাজ হয় না। কোনো গোয়েন্দার পরামর্শ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের মানা এবং তড়িঘড়ি করে তা বাস্তবায়নের জন্য বলাটা রহস্যজনক। প্রক্টর এতোবড় হনু হয়ে যাননি যে, এমন একটা স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিয়ে নেবেন। ভালো করে তদন্ত করলে অনেক রহস্যই বেরুতে পারে বলে আমার ধারণা।
তবে মুছে দেওয়া গ্রাফিতির জায়গায় শিক্ষার্থীরা জটজলদি একই বিষয়ে নতুন গ্রাফিতি এঁকেছেন। কিন্তু আন্দোলনের আগ্নেয় সময়ে তারুণ্যের ঘৃণামিশ্রিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান গ্রাফিতিটি চক্রান্ত বা অবিমৃষ্যকারিতায় মুছে যাওয়ার ক্ষতি পূরণ হবার নয়।
তবে এই ঘটনা ছাত্র-তরুণদের চেতনায় নতুন করে ঘা দিয়েছে। তারা জেগেছে, আরো সচেতন হয়েছে। ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে ওই গ্রাফিতির স্তম্ভটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘৃণাস্তম্ভ হিশেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
আমরা প্রত্যাশা করবো এমন ধৃষ্টতার পুনরাবৃত্তি যেন আর কোথাও কেউ কখনো না করে।
মারুফ কামাল খান: সাংবাদিক ও লেখক; বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেসসচিব