Logo
Logo
×

জাতীয়

আনন্দবাজারের প্রতিবেদন

বাংলাদেশকে পুঁজি করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নানা সমীকরণ

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:২৭ এএম

বাংলাদেশকে পুঁজি করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নানা সমীকরণ

ছবি : সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরজি কর আন্দোলন এখন অনেকটাই অতীত। তবে সম্প্রতি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতার ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে ‘অস্ত্র’ করে বিজেপিসহ হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি দল নতুন করে রাজনীতি শুরু করেছে। শুধু তাই নয় তারা রীতিমতো রাস্তায় নামে আন্দোলন করতে চাইছে। তবে বিরোধী দলগুলোর এমন হিসাব-নিকাশ আঁচ করতে পেরে রাজ্যটির শাসকদল তৃণমূলও অবস্থান নিয়েছে। যদিও সেটি খানিক ‘এলোমেলো’ বলে দলেরই অনেকে মনে করছেন। 

বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) ভারতের আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে যেমন বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানই মেনে নেবেন, তেমনই আবার বিধানসভায় দাবি তুলেছেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিবাহিনী পাঠানোর। অর্থাৎ এপারের সংখ্যালঘু ভোটের সঙ্গে তার হিসাবে ওপারের সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্কও যে নেই তা নয়। আবার তিনি বারংবার বলছেন, ‘আমরা সকলকেই ভালোবাসি।’

আনন্দবাজার বলছে, প্রত্যাশিতভাবেই বাংলাদেশকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে লাভের হিসাবনিকাশ কষতে শুরু করে দিয়েছে। বিশেষত, বিরোধী পরিসরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর রাস্তায় নামা এবং আন্দোলনে থাকার ‘তাগিদ’ চোখে পড়ছে। অনেকের মতে, তাতে ‘অক্সিজেন’ দিচ্ছে বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভূমিকাও। তাতে যেমন স্বাভাবিক নিয়মে বিজেপি রয়েছে, তেমনই রয়েছে সিপিএম-কংগ্রেসও। আনুষ্ঠানিকভাবে অঙ্কের কথা না মানলেও একান্ত আলোচনায় প্রত্যেক শিবিরের নেতারা তাদের ‘ফরমুলা’র কথা গোপন করছেন না।

বিজেপির সমীরকণ

সংবাদমাধ্যমটির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের লোকসভা, ২০২১ সালের বিধানসভা কিংবা ছয় মাস আগে হয়ে যাওয়া আরও একটি লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনীতির মূল অস্ত্রই ছিল ‘মেরুকরণ’। তার সঙ্গে জুড়ে ছিল দুর্নীতি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে শাসকদল তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ। 

কিন্তু ২০১৯ সালে হঠাৎ পাওয়া সাফল্য পরবর্তীকালে আর ধরে রাখতে পারেনি তারা। সেই বিজেপি বাংলাদেশে ‘হিন্দুদের ওপর অত্যাচার’ নিয়ে সরব। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তো বটেই, সহায়ক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বও ধারাবাহিক কর্মসূচি নিচ্ছেন। সমান্তরালভাবে চলছে সমাজিক মাধ্যমের প্রচার। 

এদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপি মুখপাত্র রাজর্ষি লাহিড়ী অবশ্য বলছেন, আমরা কোনো লাভ-ক্ষতি দেখে রাস্তায় নেই। বাঙালি হিন্দুদের বিপন্ন অবস্থা আমাদের উদ্বিগ্ন করছে। তিনি বলছেন, ৫০০ বছর আগে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে যা হয়েছিল, ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণের সঙ্গেও তা-ই হয়েছে।

যদিও বিজেপির অনেক নেতা একান্ত আলোচনায় মানছেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়ে এপার বাংলায় আবেগ রয়েছে। কলোনি এলাকার বহু মানুষ এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবেন। ফলে সংঘবদ্ধ করার প্রশ্নে কর্মসূচি করতে হচ্ছে। এ কথা ঠিক যে, গত কয়েকটি ভোটে বিজেপি যেমন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘হিন্দু-মুসলমান’ বা ‘৭০ শতাংশ-৩০ শতাংশ’-এর কথা বলেছে, তেমন তৃণমূলও ‘বাঙালি অস্মিতা’কে জাগিয়ে বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ প্রমাণ করার রাজনৈতিক আখ্যান তুলে ধরেছিল। 

বিজেপির অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ‘বিপন্নতা’ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলন জারি রাখতে পারলে তৃণমূলের বাংলা ও বাঙালির রাজনীতিকে ‘ধাক্কা’ দেওয়া যাবে। তবে সে জন্য সাংগঠনিক জোর কতটা রয়েছে, তা নিয়েও সংশয়ের কথা গোপন করছেন না পদ্মশিবিরের প্রথম সারির নেতারা। কারণ, আন্দোলন আর ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন যে ঐকিক নিয়মে হয় না, তা বিজেপি নেতাদের অজানা নয়। 

আরজি কর আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিজেপি রাংলাদেশের সংকটকে পুঁজি করতে চাইছে উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আরজি কর আন্দোলনে যে নাগরিক ক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল রাজপথে, শহরাঞ্চলে যার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি, সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে তা কোনো ছাপ ফেলেনি। যদিও অনেকের মতে, বিজেপি যে ‘পাঠ্যক্রম’ মেনে রাজনীতি করে, তাতে আরজি কর আন্দোলন তাদের জন্য ‘উর্বর’ জমি ছিল না। তা মাসখানেকের মধ্যে প্রমাণিতও হয়েছিল। বিজেপি-ও আস্তে আস্তে রাস্তা ছাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়ে ‘উপযোগী উপাদান’ রয়েছে বলে মনে করছেন পদ্মশিবিরের নেতৃত্বের বড় অংশ।

বাম-কংগ্রেস সমীকরণ

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বাম-কংগ্রেস শূন্য। ভোট শতাংশেরও তারা প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত। সেই দুই শক্তিও অঙ্ক কষেই বাংলাদেশ নিয়ে রাস্তায় নামছে। সিপিএম সরাসরি বলছে না যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। তারা সচেতনভাবে বলছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা ‘নির্যাতিত’। একইসঙ্গে ভারত ও ফিলিস্তিনকেও জুড়ে দিচ্ছে। যার অর্থ আন্তর্জাতিকতাবাদকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। 

তবে সিপিএম নেতারা মনে মনে যে অঙ্ক কষছেন, তা হল হিন্দু ভোট। বিশেষত কলোনি এলাকার হিন্দু ভোট। যা একটা সময়ে ছিল সিপিএমের ‘শক্ত ঘাঁটি’। কিন্তু বিজেপির আগ্রাসী রাজনীতির সামনে সেই ঘাঁটি কার্যত তছনছ হয়ে গেছে। বামের ভোট ধাপে ধাপে চলে গেছে রামের বাক্সে। 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে রাস্তায় নেমে সেই ক্ষতেই প্রলেপ দিতে চাইছে বামেরা। ৬ ডিসেম্বর প্রতি বছর ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দিবস’ পালন করে বামেরা। ১৯৯২ সালের ওই দিনেই বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবার ৬ ডিসেম্বর কলকাতায় সিপিএম যে মিছিল করতে চলেছে, তার বিষয় ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদ’।

একটা সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটের সিংহভাগ ছিল বামেদের দখলে। ২০০৯ থেকে সেই ভোট ঢলে পড়েছিল মমতার দিকে। ক্রমে সেই ভোটই এখন তৃণমূলের পুঁজিতে পরিণত। আর হিন্দু ভোট টেনে নিয়েছে বিজেপি। যার ফলস্বরূপ জামানত রক্ষা করাই দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে বাম-কংগ্রেসের। মুসলিম ভোট ভাঙার ক্ষেত্রে অবশ্য কৌশল নিয়েছিল সিপিএম। ফুরফুরা শরিফ, আব্বাস সিদ্দিকি, নওশাদ সিদ্দিকের সামনে রেখে ভোট ভাঙার সেই কৌশল সফল হয়নি। বরং মালদহ, মুর্শিদাবাদের মতো যে যে জেলায় কংগ্রেসের সঙ্গে কিয়দংশ মুসলিম ভোট ছিল, তা-ও চলে গেছে তৃণমূলের দিকে।

কংগ্রেসও বাংলাদেশ নিয়ে কর্মসূচি করছে। বেলঘরিয়ার যে তরুণ বাংলাদেশে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ধর্মীয় কারণে আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ, সেই সায়ন ঘোষের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে এসেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভংকর সরকার-সহ দলের নেতারা। ফলে এটা স্পষ্ট যে, কংগ্রেসও বিরোধী পরিসরে বিজেপির সমর্থনে থাবা বসানোর কৌশল নিয়েই বাংলাদেশ নিয়ে ‘সক্রিয়’ থাকার চেষ্টা করছে। 

যদিও কংগ্রেসের তরুণ নেতা আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, বিজেপি সীমান্তে গিয়ে উত্তেজনা তৈরি করছে। কিন্তু বেলঘরিয়ায় যায়নি। তার কারণ একটাই— সায়ন বাংলাদেশে যে বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলেন, তিনি ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম। সেই পরিবার সায়নকে আগলে রেখেছিল। সায়নের বন্ধুই তাকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেদে সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বিজেপি সেটা বিপণন করতে পারবে না। তাই সায়নের বাড়িতে যায়নি।

তৃণমূলের অঙ্ক

বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে তৃণমূলের দলগত অবস্থান আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন মমতা। তার বক্তব্য, বিদেশের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার যা অবস্থান নেবে, সেটাই তৃণমূলের অবস্থান। 

মমতা দাবি করেছেন, ভারত সরকার রাষ্ট্রপুঞ্জের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশে ‘শান্তিসেনা’ পাঠাক। এভাবে শান্তিসেনা পাঠানো যায় কি না বা কূটনৈতিক স্তরে তেমন সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে তৃণমূল দলগত অবস্থান স্পষ্ট করার পরেও বাংলাদেশের বিষয়ে মন্তব্য করছে। 

বুধবার তৃণমূলের মুখপত্রে প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘ইউনূস সরকারের অসভ্যতা চলছে’। তৃণমূলও ‘কড়া’ কথা বলছে অঙ্ক কষেই। শাসকদলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, আমরা যদি এই অবস্থান না নিই, তাহলে বিজেপি হিন্দু ভোটে আরও মেরুকরণ করার চেষ্টা করবে। সেই সুযোগ ওদের দেওয়া হবে কেন?

শাসকদলের নেতারা এ-ও বলছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ালে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, তারা ভালো করে জানেন, মমতার শাসনেই তারা নিরাপদ। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজেপি যাতে ‘উসকানি’ না দিতে পারে, সে দিকেও সাংগঠনিকভাবে খেয়াল রাখতে হচ্ছে বলে দাবি শাসকদলের নেতাদের অনেকের।

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম