
প্রিন্ট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:২৯ পিএম
আস্থাহীনতার কারণে উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম: সুজন

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৪, ১০:২১ পিএম

আরও পড়ুন
নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতার কারণে উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন প্রতিটি ধাপের উপজেলা নির্বাচন শেষে ভোট পড়ার যে হার প্রকাশ করছে তা মানুষ বিশ্বাস করে না। নির্বাচন মানে যে ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা তার কোনো কিছুই উপজেলা নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত ‘ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের তথ্যের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে জানানো হয়, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের ১ হাজার ৫৩ জন উচ্চশিক্ষিত এবং ১৬০ জন স্বশিক্ষিত। ৩৮৫ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা রয়েছে। মোট প্রার্থীর ৬৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ ব্যবসায়ী।
চতুর্থ ধাপে বুধবার ৬০ উপজেলায় ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর আগে তিন ধাপে ভোটগ্রহণ হয়। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে অনলাইনে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন। এতে সভাপতিত্ব করেন সুজনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, তার কোনো কিছুই উপজেলা নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে না। আমার মতে, এ নির্বাচনটি হলো ভোটার নাই, বিরোধী দল নাই এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নাই। নির্বাচন যে নির্বাসনে চলে গেছে এটা তারই প্রতিফলন। এর মূল কারণ হলো আস্থাহীনতা। অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতার ফলে মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তিনি বলেন, নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। তাই এই ব্যবস্থার প্রতি জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে তাদের প্রতিও আস্থাহীনতা রয়েছে। আস্থাহীনতার কারণে বিরোধী দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা ভোট পাগল জাতি। এখন ভোট খরায় ভুগছি। আমরা ভোট পাগল থেকে ভোট খরার জাতিতে পরিণত হয়েছি। নির্বাচন নির্বাসনে চলে গেছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচন শুধু নির্বাসনেই যায়নি, আমি বলব নির্বাচন-ই নাই। নির্বাচন উঠে গেছে। লোক দেখোনো এক্সারসাইজ করছি। তার সর্বশেষ প্রমাণ হচ্ছে এই নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ৩৫-৩৬ শতাংশ ভোট পড়ার কথা বললেও জনগণ তা বিশ্বাস করছে না। তিনি বলেন, আমরা সামরিক শাসকের অনেক সমালোচনা করি, কিন্তু সামরিক শাসকরা যে স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে গেছে তা এখনো আঁকড়ে ধরে আছি। স্থানীয় সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা এখনো চালু রাখা হয়েছে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জমিদারিত্ব প্রথা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নেই। এই কারণে মন্ত্রী ও এমপিদের স্ত্রী, কন্যা, পুত্র, ভাই ও ভাতিজা নির্বাচন করছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জমিদারিত্ব তৈরি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না। ধারণা করা হয় যে, আওয়ামী লীগ আগে থেকেই ভেবেছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপিসহ তাদের সমমনা দলগুলো এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে না। সেক্ষেত্রে ভোট পড়ার হার কম হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই অধিক সংখ্যক প্রার্থী যেন নির্বাচনে অংশ নেয়, প্রার্থী বেশি থাকার কারণে ভোট যেন বেশি পড়ে, বিএনপি নেতারা যেন স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় বিভাজন যেন দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান না হয় ইত্যাদি কারণে আওয়ামী লীগ নির্দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কৌশল নিয়েছে। বেশিরভাগ উপজেলাতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে মূলত আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ। বর্তমানে যে ধারায় নির্বাচন চলছে তা আদৌ নির্বাচন কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দিলীপ কুমার সরকার ৪৫৯টি উপজেলার ১ হাজার ৮৭৪ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর তথ্য তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, প্রার্থীদের মধ্যে ১ হাজার ৫৩ জন উচ্চ শিক্ষিত (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর), যা মোট প্রার্থীর ৫৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম না করা প্রার্থীর সংখ্যা ২৬৯ জন, যা শতকরা ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর স্বশিক্ষিত প্রার্থী রয়েছেন ১৬০ জন। প্রার্থীদের মধ্যে ৩৮৫ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ও ৬০৭ জনের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল। ২১০ জনের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল এবং বর্তমানেও আছে। প্রথম তিন ধাপে ৩৮২ উপজেলায় ভোট হয়েছে। এতে ৮৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ উপজেলাতেই আওয়ামী লীগের নেতারা জয়ী হয়েছেন। চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ৩৩৪ ও বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র ১৬ জন বিজয়ী হয়েছেন।