Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ‘ভয় দেখাতেই’ কি ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনা সামরিক তৎপরতা

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০২:৪৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ‘ভয় দেখাতেই’ কি ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনা সামরিক তৎপরতা

চীন গত সপ্তাহে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল জুড়ে, তাইওয়ান প্রণালী থেকে টাসমান সাগর পর্যন্ত এক নাগাড়ে অনেকগুলি সামরিক মহড়া চালিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সব মহড়ার মধ্যে ছিল ‘অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন’ অস্ত্র পদ্ধতি। মহড়াগুলির লক্ষ্য ছিল এই ধরনের সামরিক হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলি কীভাবে সাড়া দেয়, তা পরীক্ষা করা।

টোকিও ইন্টারন্যশনাল ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক স্টিফেন ন্যাগী বলেন, ‘চীন এটা বোঝে যে, (যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্রের কাছের এলাকাগুলিতে) সামরিক মহড়ার ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য কিছু কৌশলগত সুবিধা আছে; কারণ ট্রাম্প প্রশাসনকে যে সব বৈশ্বিক ব্যাপার মোকাবিলা করতে হয় সে কারণেই এদিকে তাদের সক্ষমতা বেশ কম।

তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে টেলিফোনে বলেন, ‘এই সব মহড়া অনেকটা ক্ষমতার পরীক্ষা; কারণ চীন যখন এতে ফাঁক দেখবে, সে তখন এগিয়ে যাবে এবং এই শূন্যতা পূরণ করবে’।

বুধবার পিপলস’ লিবারেশান আর্মি বা পিএলএ তাইওয়ানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল থেকে ৭৪ কিলোমিটার( ৪৬ মাইল) দূরে পানিতে এই ‘গুলি চালনার মহড়া’ চালায় যার ফলে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে তাইপেই তার সামরিক বিমান ও নৌযানগুলি মোতায়েন করে।

তাইওয়ান বলছে, ‘গুলি চালনার মহড়াটি’ ছিল অঘোষিত এবং তা বাণিজ্যিক বিমান ও জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। এই ‘গুলি চালনার মহড়া’ ছাড়াও চীনের সামরিক বাহিনী তাইওয়ানের কাছাকাছি ৪৫টি চীনা সামরিক বিমান ও ১৪টি নৌ জাহাজ মোতায়েন করে জলে ও বিমান পথে ‘ জয়েন্ট কম্ব্যাট রেডিনেস ড্রিল’ পরিচালনা করে।

বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলে, ‘এ সময়ে তারা কোনো রকমের অগ্রিম সতর্ক বার্তা না দিয়ে উপকূল থেকে মাত্র ৪০ নটিক্যাল মাইল (৭৪ কিলোমিটার) দূরে তাদের ভাষায়, ‘গুলি চালনার মহড়া’ চালিয়ে নির্লজ্জভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি লংঘন করে।

যদিও এই সামরিক মহড়া সম্পর্কে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনও কোনো মন্তব্য করেনি, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ স্তরের কর্মকর্তা, ওয়াং হুনিং মঙ্গলবার তাইওয়ানের ব্যাপারে একটি বার্ষিক বৈঠকের সময়ে ‘জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণ প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে শক্ত প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানান’।

বৃহস্পতিবার চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাসিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র উ চিয়ান তাইওয়ানের কাছে ‘গুলি চালনার মহড়া’কে ‘নিয়মিত মহড়া’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাইওয়ানি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা ছিল ‘অত্যন্ত অতিরঞ্জিত’।

তিনি বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করবো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা যেন এ ধরণের খেলা বন্ধ করে’।

টনকিন উপসাগর ও টাসমান সাগর

তাইওয়ান ছাড়াও পিপলস’ লিবারেশন আর্মি ভিয়েৎনামের কাছে টনকিন উপসাগরে এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার টাসমান সাগরে সরাসরি গুলির মহড়া চালায়।

টাসমান সাগরে তিনটি চীনা নৌযানের এই সরাসরি গুলি চালনার মহড়ায় দ্রুতই ক্যানবেরা ও ওয়েলিংটন তাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। নিউজিল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জুডিথ কলিন্স বলেন চীনা জাহাজগুলিতে ‘অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন’ অস্ত্রশস্ত্র ছিল যেমন জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র- যা কীনা অস্ট্রেলিয়ায় আঘাত হানতে পারতো।

তিনি সোমবার রেডিও নিউজিল্যান্ডকে বলেন, ‘আমরা কখনই এ রকম ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক গ্রুপকে এ রকম কাজ করতে আগে কখনও দেখি নাই। তিনি আরও বলেন যে, চীনা সামরিক বাহিনী এই পরিকল্পিত মহড়ার আগে নিউজিল্যান্ড সরকারকে কিছুই জানায়নি।’

এদিকে বেইজিং ’এ এক বৈঠকের সময়ে নিউজিল্যান্ডে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইন্সটান পিটার্স চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঈ’কে বলেন যে, নৌ মহড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘একটি ব্যর্থতা’ এবং ওয়েলিংটন আশা করে ‘ভবিষ্যতের পথে সংশোধন’ করা হবে এটিকে।

নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্বেগ সত্ত্বেও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলে ক্যানবেরা ‘অন্যায়ভাবে চীনের সমালোচনা করেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করেছে, এবং আমরা অবাক হয়েছি এবং এ ব্যাপারে অত্যন্ত অসন্তোষ বোধ করছি’।

বিঘ্নসৃষ্টিকারী ও অস্থিতিশীলমূলক

চীনের এই সরাসরি গুলি চালনোর মহড়াকে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ‘বিঘ্নসৃষ্টিকারী ও অস্থিতিশীলমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলছেন যে, এই কর্মকাণ্ডে এটাই বোঝা যাচ্ছে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো ইচ্ছা বেইজিংয়ের’ নেই।

সিঙ্গাপুরের এস রাজারাতনাম স্কুল অফ ইন্টারন্যশনাল স্টাডিজের ফেলো ও পেন্টাগনের প্রাক্তন কর্মকর্তা ড্রু টমসন ফোনে ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘এটা বুঝতে পারা খুবই কঠিন যে কেন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীন পাঁচ বছরের বিরতির পর সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সংলাপ পরিচালনা করবে আর তার পর চীনের উপকূল থেকে অনেক দূরে এই সরাসরি গুলি চালনার মহড়া দিবে’।

তিনি আরও বলেন, ‘এতে মিশ্র সংকেত পাওয়া যায় আর বার্তাটি হচ্ছে শান্তি নয়, চীন বেছে নিয়েছে সহিংসতা’।

লন্ডনের কিংস কলেজের পূর্ব এশিয়ায় যুদ্ধ ও কৌশলের অধ্যাপক অ্যালেসিও পাটালানো বলেন, এই ধরনের মহড়া চীনের সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘বড় ধরনের পরিপক্বতার’ পরিচায়ক।

ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি টেলিফোনে বলেন, ‘বিশেষত তাইওয়ানের আশপাশের এলাকায় প্রতিদিনের কঠিন কার্যক্রম সত্ত্বেও তারা বার বার মহড়া চালাতে সক্ষম হচ্ছে।’

চীনের সামরিক মহড়ায় অঞ্চলিক দেশগুলি উদ্বিগ্ন হলেও, টমসন বলছেন, তাদের এটা উপলব্ধি করতে হবে যে চীনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে তাদের ‘কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলি’ ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদেরকে এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য আরও বিনিয়োগ শুরু করতে হবে।

তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘এ দেশগুলিকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে’।

নিউজিল্যান্ড ওয়ান নিউজ’এর এক সাক্ষাৎকারে নিউজিল্যান্ডের কলিন্স বলেন দেশটিকে প্রতিরক্ষার জন্য ‘আরও বেশি ব্যয়’ করতে হবে।

জাপানের ন্যাগি বলেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াও আঞ্চলিক দেশগুলির উচিৎ হবে তাদের নিকটবর্তী এলাকাগুলিতে চীনের সামরিক আগ্রাসী আচরণকে প্রামাণিক ভাবে তুলে ধরা।

ট্রাম্প প্রশাসন যেহেতু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার শান্তি আলোচনা আয়োজনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে , পাটালানো বলেন তিনি মনে করেন চীন ‘স্বল্প মেয়াদি, তেমন পূর্ব ঘোষিত নয়’ সামরিক মহড়াগুলি সামনের মাসগুলিতেও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চালিয়ে যাবে।

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম