নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, খাদ্য সংকটের সঙ্গে সাপ আতঙ্ক

নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৪, ০৭:১৬ পিএম

ফেনীর উজানের পানিতে নোয়াখালীর বন্যা পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। এতে পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ। বন্যাদুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট। ত্রাণের জন্য বন্যা এলাকায় হাহাকার অন্যদিকে বাজারে খাদ্য সংকট ও সাপের উপদ্রবে নাকাল বন্যা দুর্গতরা। অনেকের কাটছে নির্ঘুম রাত।
রোববার দুপুরের দিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আব্দুল আজিম বলেন, গত তিন দিনে নোয়াখালীতে ৬৩ জনকে সাপে কেটেছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সাপে কেটেছে ২৮ জনকে। বন্যার কারণে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১০৮ জন।
সেনবাগ উপজেলার বাসিন্দা মো. আবুল খায়ের জানান, ফেনীর মুহুরী নদীর উজানের পানি প্রবেশ করায় জেলার সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী উপজেলার আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব উপজেলায় গত দুদিন বৃষ্টির পরিমাণ কম হলেও উজানের পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়। অনেক জায়গায় ঘরবাড়ি ও সড়ক তলিয়ে গেছে। স্কুলে ঢুকে পড়েছে পানি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট।
কবিরহাটের বাসিন্দা ফরমান হোসেন বলেন, বন্যা ও ভারি বর্ষণের কারণে কবিরহাটের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ দিকে দিন মজুর খেটে খাওয়া মানুষ কাজ করতে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কর্মহীন মানুষেরা সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন সরকার ও বিত্তশালীদের কাছে। এ জেলায় কোনো সরকারি ত্রাণ বিলি হচ্ছে কিনা তা তিনি জানেন না। গত ২ দিন ধরে পরিবার নিয়ে শুকনো খাওয়ার খেয়ে বেঁচে আছেন বলে জানান।
বেগমগঞ্জের আগলাইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মেম্বার জানান, সরকার থেকে যে সামান্য চাল এসেছে তা বিতরণ করতে গেলে পাবলিকের হাতে মার খেতে হবে। বেগমগঞ্জ উপজেলা থেকে ২০০ প্যাকেট শুকনো৷ খাবার বরাদ্দ হলেও ছাত্ররা তা ইউনিয়ন পরিষদে না দিয়ে আমানউল্লাপুর ইউনিয়নের আশ্রয়ণ কেন্দ্রে ১৭৫ প্যাকেট দিয়ে চলে গেছেন।
দোয়ালিয়া এলাকার বিধবা মাসুমা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পরিবারের ৭ সদস্যকে নিয়ে ৪ দিন ধরে চালের গুঁড়া খেয়ে প্রাণ রক্ষা করেছেন। ঘরে চাল নেই, বাজারে পানি উঠেছে দোকানপাট বন্ধ।
নোয়াখালী জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক আরজুল ইসলাম বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের পানিতে বন্যার পানি বেড়েছে।
বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। প্রতিটি বাড়িতে ৩ থেকে ৫ ফুট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলো যার পরিমাণ ৬ থেকে ৭ ফুট। বসত ঘরে পানি প্রবেশ করায় বুধবার রাত পর্যন্ত অনেকে খাটের ওপর অবস্থান করলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্র, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। বসত ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় খাবার সংকটে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। জেলার প্রধান সড়কসহ প্রায় ৮০ ভাগ সড়ক কয়েক ফুট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলার প্রধান সড়ক ছাড়া সব সড়কে সড়ক যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে; যা দুই-চারটা চলছে ভাড়া ৩ গুণ ৪ গুণ।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে আটটি উপজেলার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব উপজেলায় ইতোমধ্যে ৮২৬ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। এর মধ্যে দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসন ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন।