
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৫:৪৫ পিএম
রাজশাহীতে দুস্থদের চালের কার্ডে বিএনপির ভাগ!

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৫, ০৩:৪২ পিএম

ফাইল ছবি
আরও পড়ুন
গরিব দুস্থদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে আগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবলীলায় ভাগ বসাতেন। বরাদ্দ কার্ডের একটা অংশ তারা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া তালিকার মাধ্যমে ত্রাণ সামগ্রী তুলে নিয়ে বিক্রি করতেন। তবে এখনো সেই ভাগ সংস্কৃতির কোনো বদল ঘটেনি।
বর্তমানে রাজশাহীজুড়ে গরিবের খাদ্য সহায়তায় (ভিজিএফ) ভাগ বসাচ্ছেন বিএনপি ও জামাতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দুস্থদের ভিজিএফ কার্ড ভাগাভাগি নিয়ে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে কলহ কোন্দল ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষ্যে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত স্পেশাল ভিজিএফ কর্মসূচির কার্ড বিতরণে রাজশাহী জেলার অধিকাংশ ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং সিটি এলাকায় দলীয় ভাগ বসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা না থাকলেও স্থানীয় নেতাকর্মীরা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দুস্থদের কার্ডে ভাগ বসাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, দুস্থদের কার্ড বণ্টনে দলীয় কোটার কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত অসহায় দরিদ্র মানুষ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা গেছে, রাজশাহীর নওহাটা পৌর এলাকার দুস্থদের জন্য ঈদ উপলক্ষ্যে ৪ হাজার ৬২১ টি কার্ড বরাদ্দ আসে। প্রতি কার্ডধারীকে বিনামূল্যে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। পৌর মেয়র ও কাউন্সিলররা পলাতক থাকায় পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরাফাত আমান আজিজ পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। কার্ড বণ্টনের তালিকায় দেখা যায় পৌরসভার কর্মকর্তা কর্মচারীরা নিজেরা বণ্টনের জন্য ৬০৮টি কার্ড নিজেদের কাছে রাখেন। বাকি কার্ডগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৮৩১টি পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিকের নামে, ৮৪৫টি পৌর জামাতের নামে ও ৩৩৭টি ছাত্রদের নামে বরাদ্দ করা হয়।
এদিকে গত ২৫ মার্চ চাল বিতরণ শুরু হলে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। শুরু হয় ধাওয়া পালটা ধাওয়া। বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
কার্ড বিতরণে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে নওহাটা পৌর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিন বলেন, সভাপতি কার্ডগুলি নিয়ে অনুসারীদের দিয়ে ভুয়া নামে চাল তুলে বিক্রি করেছেন। ফলে অনেক দুস্থ মানুষ চাল নিতে এসে ফিরে গেছে। তাদেরকে বলা হয়েছে তাদের চাল আগেই বিতরণ হয়ে গেছে।
তবে পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি বা আমার লোকজন সুষ্ঠুভাবে চাল বিতরণ করেছেন। কোন অনিয়ম ঘটেনি।
দুস্থদের চালের কার্ডে দলীয় ভাগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নওহাটা পৌরসভার প্রশাসক আরাফাত আমান আজিজ বলেন, ভিজিএফ বিতরণে আমরা বিএনপি নেতাকর্মীদের সহায়তা নিয়েছি মাত্র। তাদেরকে দলীয় কোটা দেওয়া হয়নি।
এদিকে গত ২০ মার্চ ভিজিএফের চাল পাচারকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর গোগ্রাম ইউনিয়নের ধাতমা এলাকার দুই বিএনপি নেতাকর্মীর বাড়ি থেকে ২ হাজার ৬৭৩ কেজি চাল জব্দ করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সাল আহমেদ।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকায় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসলাম আলী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। গত ২০ মার্চ অর্ধেক চাল বিতরণ শেষে বাকি চাল বিক্রি করে দেন এই বিএনপি নেতা। চাল পাচারের ঘটনায় দুই বিএনপি কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে থানায়।
অন্যদিকে গোগ্রাম ইউনিয়নে দুস্থদের চাল পাচারের অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অপসারণের অভিযোগে গত ২৩ মার্চ ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মীরা উপজেলার ফরাদপুর এলাকায় মানববন্ধন করেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আসলাম আলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আসলাম আলী দাবি করেন চাল পাচারে তিনি জড়িত নন। বিএনপির একটি পক্ষ তাকে হেয় করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, গোদাগাড়ী, পবা, মোহনপুর, বাগমারা, পুঠিয়া দুর্গাপুর ও বাঘা চারঘাট এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে দুস্থদের কার্ড বিতরণে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। দলীয় কোটায় কার্ড নিয়ে চাল তুলে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বাঘার বাউসা ইউনিয়নে।
জানা গেছে, গত ২০ মার্চ বাঘার বাউসা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে দুস্থদের ভিজিএফের চাল বিতরণ করছিলেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে কার্ডের তালিকা প্রণয়নে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সেখানে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এ সময় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মাঝে সংঘর্ষ বেধে গেলে দুই পক্ষের ১০ জন আহত হয়েছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষ্যে অসহায় দুস্থ ও গরীব মানুষদের মাঝে বিতরণে জেলায় ১ লাখ ২২ হাজার ৯৯৪ টি কার্ড বরাদ্দ আসে। এসব কার্ড জেলার ১৪ পৌরসভা ও ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয় বিতরণের জন্য। তবে প্রতিটি এলাকা থেকেই কার্ড বিতরণে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ এসেছে ত্রাণ শাখায়।
দুস্থদের কার্ডে দলীয় ভাগ বসানোর অভিযোগের বিষয়ে জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার বলেন, সরকারি এ সহায়তা যাতে প্রকৃত দুস্থরা পায় সে বিষয়ে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দু একটি স্থানে কিছু অনিয়মের খবর এসেছে। সেগুলো কেন ঘটেছে আমরা খতিয়ে দেখছি। দলীয় কোটা বলে কোনো কিছু নেই বলে তিনি দাবি করেন।
দুস্থদের চালে দলীয় কোটার বিষয়ে বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, চালের কার্ড বিতরণে দলীয় ভাগ বসানোর বিষয়ে আমরা আগেই নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছি। কিন্তু কেউ যদি দলীয় নির্দেশনা লঙ্ঘন করে চাল বিতরণে দলীয় প্রভাব খাটায় ও কোটা দাবি করে এবং যদি প্রমাণ মেলে আমরা তাকে দল থেকে বহিষ্কার করব।