
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:৪৭ পিএম
এখনো নেভেনি সুন্দরবনের আগুন

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৫, ১০:৫৯ পিএম
-67e18f8a2ade6.jpg)
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁপাই রেঞ্জের শাপলার বিল তেইশেরছিলা নামক স্থানে লাগা আগুন এখনো পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি। পানির সংকটের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত পাওয়া খবরে আগুন জ্বলছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত থেমে থেমে আগুন জ্বলে উঠছে। তবে তৎপর রয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে ওই এলাকার ছোট বড় খাল খনন করা ও বন বিভাগের নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস রাখার দাবি উঠেছে। এ ঘটনার কারণ উদঘাটন ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে গত দুই যুগে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৩০ বার অগ্নকিাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
বনবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রাদের আন্তরিক চেষ্টার ফলে প্রতিবারই দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে বলে সুন্দরবন সর্বদা বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পেয়েছে।
চাঁদপাই রেঞ্জের ওই সব এলাকার বনের বিলগুলিতে মাছ ধরার সুযোগ সৃষ্টি করতে জেলেরা আগুন ধরিয়ে দিয়ে পরিষ্কার করছে বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।
চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা দ্বীপন চন্দ্র দাস জানান, রোববার দুপুরে কলমতেজী এলাকায় আগুন নেভোনোর পর খবর আসে ওই এলাকা থেকে চার কিলোমিটার দূরে শাপলার বিল এলাকার তেইশের ছিলায় আগুনের ধোঁয়া দেখতে পেয়েছেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ডিএফও (পূর্ব বিভিাগ) মোহাম্মদ নুরুল করিম ও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে ছুটে যাই। ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে পর্যায়ক্রমে শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট, মংলা, চিতিমলমারী ও খুলনার মোট দশটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে সংযুক্ত হয়।
লোকালয় থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বনের গভীরে এবং দুর্গম হওয়ায় কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিকালে জোয়ার এলে অংশগ্রহণকারী ফায়ার সার্ভিসের টিম পুরোদমে কাজ শুরু করেন। সারারাত আপ্রাণ চেষ্টো করে আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (খুলনা) মো. আবু বকর জানান, রোববার রাতে তাদের টিম পাম্প বসিয়ে পানি ছিটানোর কাজ শুরু করে। পরে খুলনা ও বাগেরহাটের দশটি ইউনিট অগ্নিনির্বাপণ কাজে যুক্ত হয়।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ ইমরান আহমেদ জানান, পানি সংকটের কারণে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। জোয়ারের সময় যতক্ষণ পানি থাকছে, ততক্ষণ ফায়ার সার্ভিসের টিম পানি দিচ্ছে। আগুন কখন সম্পূর্ণ নেভানো সম্ভব হবে, তা বলা যাচ্ছে না। তবে আগুন ফায়ার লাইনের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রয়েছে।
বনসংলগ্ন গ্রাম গুলিশাখালী, আমরবুনিয়া বান্দাঘাটা, উত্তর রাজাপুর, দক্ষিণ রাজাপুর ও জিউধারা এলাকার নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একাধিক ব্যক্তি জানান, চাঁদপাই রেঞ্জের এলাকার বনে ছোট বড় বিল রয়েছে। বিলগুলিতে বৃষ্টির মৌসুমে প্রচুর দেশী শিং, মাগুর, শোল, টাকি ও কৈ মাছ পাওয়া যায়। তাই বৃষ্টির মৌসুম আসার আগেই লোকালয়ের কিছু স্বার্থান্বষেী মহল বিলগুলি পরিষ্কার করতে গাছপালায় আগুন লাগিয়ে দেয়।
তারা আরও জানান, বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী এ বিলগুলি অঘোষিতভাবে নিলাম দেন। বনসংলগ্ন লোকালয়ের প্রভাবশালী মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে প্রকারভেদে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লেনদেন হয়।
এছাড়া মধুর মৌসুমে মৌয়ালদের নিক্ষিপ্ত আগুন থেকেও অনেক সময় বনে আগুন লেগে থাকে। যথাযথ তদন্ত হলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে তারা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই যুগে সুন্দরবনে অন্তত ২৫ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বন বিভাগের হিসাব মতে, এসব ঘটনায় ৯০ একর বনভূমি ভস্মিভূত হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাব মতে এর পরিমাণ আরও বেশি।
তথ্যমতে, ২০০২ সালের ২২ মার্চ শরণখোলা রেঞ্জের কটকা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে এক একর বনভূমি পুড়ে গেছে। ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলীতে অগ্নিকাণ্ডে এক একর, একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর আড়ুয়াবেড় এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে ৯ শতক, ২০০৫ সালের ৮ এপ্রিলে কলমতেজী এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে এক একর বনভূমি, একই বছরের ১৩ এপ্রিল তুলাতলায় অগ্নিকাণ্ডে ৪.৫ একর, ২০০৬ সালের ১৯ মার্চ তেরাবেকা ও একই সালের ১১ এপ্রিল আমরবুনিয়ায়, একই বছরের ১ মে পচাকোরালিয়ায় ৫০ শতক, ৪মে ধানসাগর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ২.৫ একর, ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি এবং ১৯ ও ২৮ মার্চ একই এলাকায় ১৫ একর, ২০১৬ সালে ২৭ মার্চ নাংলী, ১৩ এপ্রিল ৮.৫ একর, ১৮ এপ্রিল আব্দুল্লারছিলা, ২৭ এপ্রিল তুলাতলায়, ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ধানসাগর টহলফাড়ি এলাকায় চার শতক, ২০২৪ সালের ৪ মে আমরবুনিয়ায়, ২০২৫ সালের ২১ মার্চ কলমতেজীতে চার একর বনভূমি পুড়ে যায়।
সর্বশেষ ২৩ মার্চ শাপলার বিলের তেইশের ছিলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে; যা এখনো পুরোপুরিভাবে নেভেনি।