
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:২৪ পিএম
সন্ত্রাসীরা হয় কারাগারে না হয় সিএমপির বাইরে থাকবে: কমিশনার

চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫, ১০:৩০ পিএম

চট্টগ্রামে পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও হত্যা-চাঁদাবাজিসহ ১৫ মামলার আসামি সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি থেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি টিম তাকে গ্রেফতার করে।
রোববার দুপুরে সিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার হাসিব আজিজ গ্রেফতার ছোট সাজ্জাদের অপকর্মের কাহিনী এবং দীর্ঘ চেষ্টার ফসল হিসেবে তাকে গ্রেফতারে সফল হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দুর্ধর্ষ সাজ্জাদকে গ্রেফতার অন্য সন্ত্রাসীদের জন্য একটি বড় মেসেজ। তাদের হয় কারাগারে থাকতে হবে না হয় মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে। সিএমপির চার থানা এলাকায় সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি খুন-রাহাজানি করে পুলিশের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল এই সন্ত্রাসী।
এদিকে গ্রেফতারের পর রোববার সকালে সাজ্জাদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। আদালতে হাজির করে তার ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন জানালে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সিএমপি কমিশনরা বলেন, তিনি সিএমপিতে যোগদানের পর থেকেই শুনছেন সাজ্জাদ নামে এক সন্ত্রাসী মেট্রোপলিটন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন, ঝুট ব্যবসাসহ যেখানেই টাকার গন্ধ আছে সেখানে দলবল নিয়ে হাজির হতো সাজ্জাদ। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হামলা করছে। বায়েজিদ এলাকায় ডাবল মার্ডারের ঘটনায়ও সে জড়িত ছিল। এমনকি ফেসবুকে এসে সিএমপির এক ওসিকে ন্যাংটো করে পেটানোর হুমকি প্রদান করে। তার এমন দুঃসাহস, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অনেকে হতবাক হয়। এই অবস্থায় সিএমপি তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন সোর্স নিয়োগ করে। একাধিকবার পুলিশের হাত ফসকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এমনকি পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে এই সন্ত্রাসী এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং এ লাফিয়ে পড়ে। তাকে ধরতে গিয়ে পুলিশও আহত হয় কিন্তু এরপরও পুলিশ হাল ছাড়েনি।
সিএমপি কমিশনার জানান, আমরা গোপন সূত্রে খবর পাই, ছোট সাজ্জাদ রাজধানীতে অবস্থান করছে। সে শনিবার রাতে ঢাকার বসুন্ধরা সিটিতে শপিং করতে যাবে। এই খবর পাওয়ার ঢাকায় প্রশিক্ষণের জন্য থাকা সিএমপির ডিসি (নর্থ) আমিরুল ইসলামকে সাদা পোশাকে সেখানে অবস্থান নিতে বলেন। এডিসি (নর্থ) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম থেকে সাজ্জাদের মোবাইল ট্রেকিংয়ের লোকেশন ও গতিবিধির খবর নিয়ে ডিসি নর্থ আমিরুল ইসলামকে আপডেট দিচ্ছিলেন। তাছাড়া সিএমপির বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি টিম, নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিমকেও সেখানে পাঠানো হয়। পরে তেজগাঁও থানার একটি টিমও বসুন্ধরা সিটি এলাকায় অবস্থান নেয়।
শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বসুন্ধরা সিটিতে ছোট সাজ্জাদ প্রবেশ করলে তাকে গ্রেফতার অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যরা তৎপর হয়। সাদা পোশাকে তাকে জাপটে ধরে ফেললে সাজ্জাদ পালিয়ে যেতে ধ্বস্তাধস্তি শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ উপস্থিত সাধারণ লোকজনের সহায়তা নেয়। আটক ব্যক্তি চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী- এই বলে তাকে গ্রেফতারে তাদের সহায়তা কামনা করেন। একপর্যায়ে তাকে গ্রেফতারের পর প্রথমে তেজগাঁও থানায় সেখান থেকে রোববার ভোররাতে চট্টগ্রাম নিয়ে আসা হয়।
সিএমপি কমিশনার বলেন, ছোট সাজ্জাদ সিএমপির উত্তর ডিভিশনের চারটা থানায় ত্রাস সৃষ্টির পাশাপাশি রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এলাকায়ও রয়েছে তার সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিস্তার। তার রাজনৈতিক পরিচয় কী তা আমাদের বিবেচ্য নয়। সে আমাদের কাছে অপরাধী, সে একজন ক্রিমিনাল এটাই তার পরিচয়।
এদিকে শীর্ষ অপরাধী হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন প্রকাশ ছোট সাজ্জাদের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালত এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সিএমপির এডিসি (প্রসিশকিউশন) মো. মফিজ উদ্দীন বলেন, তাহসিন হত্যা মামলায় ছোট সাজ্জাদের ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকালে চান্দগাঁও থানার অদুরপাড়া এলাকায় দোকানে বসে চা পানের সময় তাহসিন নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে কালো রংয়ের একটি গাড়িতে করে আসা লোকজন। ওই ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় তাহসিনের বাবার করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছিল ছোট সাজ্জাদকে।
পুলিশের তথ্যানুসারে, ছোট সাজ্জাদ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। সে বিদেশে পলাতক ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত আরেক সন্ত্রাসী, এইট মার্ডার, কাউন্সিলর লিয়াকত হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি সাজ্জাদ আলীর অনুসারী। তার বাড়ি হাটহাজারী উপজেলায়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির ১৫টি মামলা আছে।
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই চান্দগাঁও থানা-পুলিশ অস্ত্রসহ ছোট সাজ্জাদকে একবার গ্রেফতার করে। পরের মাসে সে জামিনে বেরিয়ে যায়। একই বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর সাজ্জাদ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে। গত বছরের ২৯ আগস্ট নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানার অক্সিজেন কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে মাসুদ কায়সার (৩২) ও মোহাম্মদ আনিস (৩৮) নামে দুজনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেয় ছোট সাজ্জাদ।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার কালারপোল এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদা না পেয়ে গুলি করেন সাজ্জাদ। ওই ঘটনার একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এরপর ৪ ডিসেম্বর নগরীর অক্সিজেন এলাকায় সাজ্জাদকে পুলিশ ধরতে গেলে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি ডাকাতির প্রস্তুতির সময় তার ছয় সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
২৮ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে এসে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসিকে হুমকি দেয় সাজ্জাদ। ফেসবুক লাইভে বলে- ‘ওসি আরিফ দেশের যেখানেই থাকুক না কেন, তাকে আমি ধরে ন্যাংটা করে পেটাব। ওসি আরিফ থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সে আমার সন্তানকে হত্যা করেছে। আমার স্ত্রীকে আটক করে জেলে নিয়ে গেছে। তাকে আমি ছাড়ব না। পুলিশ না হলে তাকে আমি অনেক আগেই মারধর করতাম। পুলিশের প্রতি শ্রদ্ধা করি বলেই চুপ করে আছি।’
এ ঘটনায় ওসি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে সিএমপির পক্ষ থেকে ছোট সাজ্জাদের খোঁজ দিতে পারলে বা তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তবে শেষপর্যন্ত সিএমপি নিজেই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলো।