চার বাসে ডাকাতি, ঝুঁকি জেনেও মাঝরাতে বাস ছাড়েন শিক্ষক অভিভাবকরা

জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৯:২৫ পিএম

মাঝরাতে পাহাড়ি এলাকার সড়ক ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও দায়িত্বশীল শিক্ষক অভিভাবকরা মাঝরাতে পিকনিকের বাস ছাড়ে। স্কুলে বাস আসতে সময় লাগায় সারা রাত জেগে বিলম্ব করে বাসগুলো ছাড়েন তারা। আবার একযোগে চার বাসে ডাকাতি, মারধর, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও এবং মোবাইল ফোন লুণ্ঠনের পরও পিকনিকে যাওয়াকে দায়িত্বের অবহেলার কথা বলছেন সচেতন শিক্ষকরা।
এছাড়াও মামলা বা থানায় অভিযোগ না করে সরাসরি নাটোরের পিকনিকে স্পটে যাওয়াও ছিল নিরাপত্তাহীন।
স্কুলের শিক্ষক ও পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার শেষ রাতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার সোয়াইতপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চারটি বাস নিয়ে নাটোরের একটি পিকনিক স্পটের দিকে রওনা করেন। প্রায় ২০ জন শিক্ষক কর্মচারী, ৪০ জন অভিভাবকসহ ১৮০ জন শিক্ষার্থীদের বহনকৃত বাসগুলো ঘাটাইল-সাগরদীঘি সড়কের লক্ষণের বাধা এলাকায় গেলে সড়কের মাঝে গাছে গুঁড়ি ফেলে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাসে উঠে ডাকাতি শুরু করে ১০-১২ জন ডাকাত। ডাকাতরা পেছনের গাড়ি থেকে তাদের মালামাল লুট করা শুরু করে। এ সময় তিনজন ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি করে।
ডাকাতরা নগদ টাকা নিয়ে গেছে দেড় লাখ, স্বর্ণ দেড় ভরি ও ১০টা স্মার্টফোন। এ ঘটনায় মারধরের শিকার হয়েছেন ওই বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর সাখাওয়াত হোসাইন রবিন (২৫) ও অভিভাবক শহিদুল্লাহ তালুকদার (৩৯)। ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করার পর পুলিশ এলে ডাকাতরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
সাখাওয়াত হোসাইন রবিন বলেন, আমি ছিলাম দুই নম্বর গাড়িতে। ওই গাড়িতে ছিল শুধু ছাত্রী। ডাকাতরা আমার কাছ থেকে মোবাইল নেওয়ার পর যখন ছাত্রীদের দিকে যাচ্ছিল তখন আমি বাধা দেই। এর ফলে তারা আমাকে দায়ের অপর পিঠ দিয়ে আঘাত করে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সামনে থেকে একটা সাদা মাইক্রোবাস এসে আমাদের চলন্ত বাস দেখে তারা আবার দ্রুত আগের পথে চলে যান। আমার মনে হচ্ছে ডাকাতিটা পূর্বপরিকল্পিত। তা না হলে বাসের সামনে গাছ ফেলে চলন্ত গাড়িতে ডাকাতি সম্ভব না। শিক্ষক, অভিভাবকদের পরামর্শ নিয়েই আমরা পিকনিকে গেছি।
ডাকাতদের অস্ত্র এবং ভয়ংকর রূপ দেখে গাড়িতে জ্ঞান হারান কৃষি বিষয়ের শিক্ষক আবুল কালাম (৫২)। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল শিক্ষক হয়ে ডাকাতির পর পিকনিকে যাওয়া ঠিক হয়নি। তারপরও শিক্ষার্থীদের মন ফ্রেস করতে ও তাদের একটু আনন্দ দিতে আমরা পিকনিকে গেছি।
সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সিনথিয়া আক্তার জানায়, ভয়ে সে অনেক কেঁদেছে। এখনো তার ভয় দূর হয়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, আমাদের মাঝরাতে যাওয়ার কথা ছিল। বাসগুলো আসতে একটু সময় লাগায় যেতে বিলম্ব হয়েছে। ইতোপূর্বে আমাদের এলাকার ভবানীপুর উচ্চ বিদ্যালয়, অন্যেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা একই এলাকায় পিকনিক করেছে। তারাও মাঝরাতে গিয়েছিল। তাদের কোনো সমস্যা না হওয়ায় আমরা ইউএনওর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম। তবে ফুলবাড়িয়া থানা বা ঘাটাইল থানা পুলিশকে রাতে রওনা হওয়ার বিষয়টি অবগত করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, নাটোর থেকে ঘুরে এসে রাতে অজ্ঞাত ১০-১২ জন আসামিকে করে মামলা করেছি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য লিয়াকত হোসেন বলেন, মাঝে মধ্যেই লক্ষণের বাধা স্থানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। গত বুধবারও একই স্থানে ডাকাতি হয়।
মালিরচালা গ্রামের লিটন ভূঁইয়া বলেন, সড়কে গাছ ফেলে একই কায়দায় বুধবারের ডাকাতির ঘটনায় মোটরসাইকেল ও কাঁচামালের ট্রাক আটক করে তাদের কাছ থেকে সব লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। মাঝে মধ্যেই এই সড়কে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।
এর আগে একই সড়কে ১৫ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত দেড়টার দিকে উপজেলার সন্ধানপুর ইউনিয়নের ফকিরচালা এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতির কবলে পড়েছিল ১০টি ট্রাক, সিএনজি ও মোটরসাইকেল। ডাকাতরা চালকদের থেকে নগদ টাকাসহ স্মার্টফোন লুট করে নিয়ে যায়। ভাঙচুর করা হয় যানবাহন। চালকদের করা হয় মারধর।
গত নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এক মাসে ঘাটাইলে পাঁচ বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা ওই পাঁচবাড়ি থেকে নগদ টাকাসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। একই সড়কে বারবার ডাকাতির পরও ফুলবাড়িয়া ও ঘাটাইল থানাকে অবগত না করে মাঝরাতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নির্জন পাহাড়ি সড়ক দিয়ে যাত্রা করা উচিত হয়নি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, বাস ডাকাতির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রাতেই মামলা নেওয়া হয়েছে। ডাকাতদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।